সোমবার, 12 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ফেলানী হত্যার ১৫ বছর: আজও মেলেনি ন্যায়বিচার

সীমান্তে নির্মমভাবে ভারতীয় বাহিনীর হাতে নিহত ফেলানী হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে প্রাণ হারায় কিশোরী ফেলানী। হত্যার পর প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারের ওপর ঝুলে ছিল তার মরদেহ। দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় তার পরিবার।

ফেলানী হত্যার ১৫ বছর: আজও মেলেনি ন্যায়বিচার

সীমান্তে নির্মমভাবে ভারতীয় বাহিনীর হাতে নিহত ফেলানী হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে প্রাণ হারায় কিশোরী ফেলানী। হত্যার পর প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারের ওপর ঝুলে ছিল তার মরদেহ। দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় তার পরিবার।

ঘটনার দিন, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি, ফেলানী তার বাবার সঙ্গে ৯৪৭ নম্বর আন্তর্জাতিক ৩ নম্বর সাব-পিলারের কাছ দিয়ে মই বেয়ে কাঁটাতার অতিক্রম করে দেশে ফিরছিল। সে সময় ভারতের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের টহলরত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ তাকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর দীর্ঘদিন ধরে বিচারের আশায় বিভিন্ন দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা পায়নি পরিবারটি।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ফেলানী দিবসকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছে তার পরিবার। কবরস্থান ও আশপাশ পরিষ্কার করা হচ্ছে। সেখানেই কথা হয় ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ও মা জাহানারার সঙ্গে।

তারা জানান, সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাদের তাড়া করে বেড়ায়। গভীর রাতে মেয়ের আর্তচিৎকার কানে ভেসে ওঠে, চোখের সামনে ভাসে কাঁটাতারে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝুলে থাকা মেয়ের ছবি। ১৫ বছর ধরে শোক আর অপেক্ষার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। মানবাধিকার সংস্থা থেকে শুরু করে নানা মহলে আবেদন জানালেও আজও বিচার মেলেনি।

এদিকে, জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং প্রতিবেশী দেশের সরকারের মধ্যে সীমান্ত হত্যাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে গত ৯ ডিসেম্বর গুলশান-২ থেকে প্রগতি স্মরণী পর্যন্ত সড়কের নামকরণ করা হয় ‘ফেলানী সড়ক’। এর আগে, ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে পিপলস অ্যাকটিভিস্ট কোয়ালিশন (প্যাক) গুলশানে ভারতীয় দূতাবাস সংলগ্ন সড়কের নাম ‘শহীদ ফেলানী সড়ক’ ঘোষণা করে সেখানে একটি নামফলক স্থাপন করে।

গত কয়েক বছর ধরে ‘নাগরিক পরিষদ’ ৭ জানুয়ারিকে ‘ফেলানী দিবস’ ঘোষণার দাবি, হত্যার বিচার, পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বারিধারা পার্ক রোডের নাম ‘ফেলানী স্মরণী’ করার দাবিতে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করে আসছে।

নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দীন জানান, তাদের প্রস্তাবিত সড়কের নামকরণ না হলেও গুলশান-২ থেকে প্রগতি স্মরণী পর্যন্ত সড়কের নাম ‘ফেলানী সড়ক’ রাখায় তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, ২০১৫ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে বিশ্বব্যাপী সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ৭ জানুয়ারিকে ফেলানী দিবস ঘোষণার দাবিতে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। তখন জানানো হয়, এটি বাস্তবায়নে জাতিসংঘের কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আনতে হবে—সেই উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

মামলার আইনি প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহার জেলার বিএসএফের ১৮১ সদর দপ্তরে অবস্থিত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। এই রায় প্রত্যাখ্যান করে ১১ সেপ্টেম্বর ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের আশায় ভারত সরকারকে চিঠি দেন। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার শুরু হলেও নানা কারণে তা বারবার স্থগিত হয়।

পরবর্তীতে ২০১৫ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ক্ষতিপূরণের দাবিতে আরেকটি মামলা দায়ের করে। ৩১ আগস্ট ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ফেলানীর পরিবারকে ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ জানায়। তবে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘটনায় ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলামকেই দায়ী করে বক্তব্য দেয়। এরপর ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে একাধিকবার শুনানির তারিখ পিছিয়ে যায়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির দিন ধার্য হলেও তা আজও অনুষ্ঠিত হয়নি।

ফেলানী হত্যা মামলার বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। কুড়িগ্রাম জেলা জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট বজলুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।

এছাড়া, ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ও বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী যৌথভাবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। পরে ২০১৫ সালের ২১ জুলাই ফেলানীর বাবার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণের আবেদনও করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী মুঠোফোনে বলেন, ‘মামলাটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।’