গাজায় টানা রক্তপাত থামায় ফিলিস্তিনিদের জন্য বিদায়ী বছরটি সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এলেও সামনে অপেক্ষা করছে আরও গভীর অনিশ্চয়তা। ইসরায়েলের গাজা দখলের সুস্পষ্ট নীলনকশা এবং পশ্চিম তীরে দখলদারির বিস্তার নতুন বছরকে কঠিন করে তুলতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের মনে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা গাজায় স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে না পারলেও, গত অক্টোবর মাসে দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলের নির্বিচার সামরিক অভিযান বন্ধ হয়েছে। তবে একতরফা এই যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গাজাকে কার্যত দুই ভাগ করে দেওয়া কথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা ‘হলুদ রেখা’ যে উপত্যকাটি দখলের পরিকল্পনার অংশ, তা প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন ইসরায়েলি সেনাপ্রধান।
ইসরায়েলের নানা কূটনৈতিক কৌশলের মাঝেও ট্রাম্প তাঁর শান্তি প্রস্তাবের দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই ধাপের মূল দুই শর্ত হলো—গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার এবং সেখানে একটি আন্তর্জাতিক ‘অস্থায়ী’ বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ। তবে সেনা প্রত্যাহারে ইসরায়েল সম্মত নয়, আর হামাস বলছে—স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেই তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে।
এই বাস্তবতায় গাজার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। একদিকে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও দখল পরিকল্পনা, অন্যদিকে হামাসের প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা—এই টানাপোড়েনে সংঘাত কত দিন থেমে থাকবে, নতুন বছরে সেটিই হবে প্রধান আলোচ্য।
‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হয়। ওই দিন হামাসসহ গাজার স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলো দক্ষিণ ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালালে, সেটিকে কেন্দ্র করে একই দিন থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। মাঝখানে বন্দিবিনিময়ের জন্য স্বল্প বিরতি ছাড়া টানা দুই বছর চলে এই অভিযান। ‘পোড়ামাটি নীতি’র ফলে পুরো উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কঠোর অবরোধে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ, দুধের অভাবে মারা যেতে থাকে শিশুরা।
এই অবরোধ ভাঙার উদ্যোগ হিসেবে সমুদ্রপথে গাজার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’। প্রথম বহরটি ৩১ আগস্ট স্পেনের বার্সেলোনা থেকে যাত্রা করে। ১৩–১৫ সেপ্টেম্বর তিউনিসিয়া ও ইতালির সিসিলি দ্বীপ থেকে আরও নৌযান যুক্ত হয়। পরে গ্রিসের সাইরাস দ্বীপ থেকেও ত্রাণবাহী নৌযান বহরে যোগ দেয়। এসব নৌযানে খাদ্য, চিকিৎসাসামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা ছিল।
শুরুর দিকে বহরে ৫০টির বেশি জাহাজ এবং অন্তত ৪৪ দেশের শত শত স্বেচ্ছাসেবক, কর্মী ও আইনপ্রণেতা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সুইডিশ জলবায়ু অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ ও বাংলাদেশি আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। প্রতিকূল আবহাওয়া ও মাল্টা ও ক্রিটের কাছে সন্দেহভাজন ড্রোন হামলায় কিছু জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বহরে ৪৪টি জাহাজ অবশিষ্ট ছিল।
তবে ইসরায়েল কোনো জাহাজকেই গাজায় ভিড়তে দেয়নি। সব নৌযানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেগুলো ইসরায়েলের সমুদ্রবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পাঁচ শতাধিক অধিকারকর্মীকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
‘অপারেশন গিডিয়নস চ্যারিয়ট’
চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি ইসরায়েল ‘অপারেশন গিডিয়নস চ্যারিয়ট’ নামে গাজায় নতুন সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজা নগরীকে লক্ষ্য করে চালানো এই অভিযানের জবাবে হামাস ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে দুই মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেও ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে।
এই অভিযানে গাজা নগরীর অবশিষ্ট ঘরবাড়ি ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। কার্যত অচল হাসপাতাল ও সেখানকার চিকিৎসক-কর্মীরাও হামলার বাইরে থাকেননি। এমনকি বিস্ফোরকভর্তি চালকবিহীন সাঁজোয়া যান ব্যবহার করেও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।
অবিরাম হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি। জাতিসংঘ–সমর্থিত কমিশন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই অভিযানকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ট্রাম্পের ২০ দফা ও একতরফা যুদ্ধবিরতি
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ২০ দফা পরিকল্পনা প্রকাশ করে হোয়াইট হাউস। এতে বলা হয়, উভয় পক্ষ সম্মত হলে যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সব জীবিত ও মৃত জিম্মি বিনিময় এবং ইসরায়েলে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল।
পরিকল্পনায় গাজা শাসনের দায়িত্ব একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকারের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়, যেখানে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না এবং সংগঠনটি অস্ত্র ত্যাগ করবে। একই সঙ্গে গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) মোতায়েনের প্রস্তাবও রাখা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং হামাস বন্দিদের হস্তান্তর করে।
চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০০ ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের কথা থাকলেও জাতিসংঘ ও এনজিওগুলোর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ঢুকছে মাত্র ১০০–৩০০ ট্রাক। প্রয়োজনীয় তাঁবুও ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরায়েল। চুক্তি লঙ্ঘন করে এখনো মিসর সীমান্তবর্তী রাফাহ ক্রসিং খোলা হয়নি।
যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল প্রায় ৮০০ বার হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ৪১১ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এর মধ্যে ১৩ ডিসেম্বর গাজা নগরীতে হামলায় হামাসের সামরিক শাখা কাসাম ব্রিগেডের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার রায়েদ সাদ নিহত হন।
গাজা দখলের ‘হলুদ রেখা’
যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েল নির্দিষ্ট একটি সীমারেখা বরাবর সেনা সরিয়ে নেয়, যাকে বলা হচ্ছে ‘ইয়েলো লাইন’। খসড়া মানচিত্রে দেখা গেছে, এই রেখার মাধ্যমে গাজার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।
এই রেখার কাছাকাছি গেলেই ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে গুলি ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে। ৬ ডিসেম্বর সাতজন ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাদের মধ্যে ছিলেন ৭০ বছর বয়সী এক নারী ও তাঁর ছেলে। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা পৃথক হামলায় তিনজনকে হত্যা করেছে, যারা ‘ইয়েলো লাইন’ অতিক্রম করেছিলেন।
ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির ঘোষণা দিয়েছেন, ‘হলুদ রেখাই গাজা ও ইসরায়েলের নতুন সীমান্ত হবে।’ তিনি বলেন, ‘হলুদ রেখা হবে (ইসরায়েলের) নতুন সীমান্ত। এটি আমাদের সম্মুখ প্রতিরক্ষা রেখা হিসেবে কাজ করবে। এই রেখা বরাবর আমাদের অভিযান কার্যক্রম চলবে… আমরা এই প্রতিরক্ষা রেখা থেকে সরব না।’
আন্তর্জাতিক বাহিনী ও পশ্চিম তীর
যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন নিয়ে কাতারের দোহায় আলোচনা শুরু হয়েছে, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। সবকিছু ঠিক থাকলে নতুন বছরের শুরুতেই সেনা মোতায়েন হতে পারে। ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, তারা স্বাস্থ্য ও নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ ২০ হাজার সেনা পাঠাতে প্রস্তুত।
তবে আন্তর্জাতিক বাহিনী কোথায় মোতায়েন হবে—সীমান্তে না গাজার ভেতরে—তা নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলের অবস্থান ভিন্ন। মার্কিন সূত্রগুলো বলছে, ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রিত এলাকাতেই বাহিনী মোতায়েন হতে পারে।
এদিকে পশ্চিম তীরেও আগ্রাসন থামেনি। ইসরায়েল সেখানে আরও ১৯টি অবৈধ বসতি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। ২১ ডিসেম্বর অর্থমন্ত্রী বেজেলাল স্মোতরিচ জানান, তাঁর প্রস্তাবেই জুদেয়া ও সামারিয়া এলাকায় এসব বসতি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে তিন বছরে পশ্চিম তীরে অনুমোদিত বসতির সংখ্যা দাঁড়াল ৬৯টি।
জাতিসংঘ বলছে, ২০১৭ সাল থেকে অবৈধ বসতি স্থাপন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ১২ হাজার ৮১৫টি অবৈধ ঘর নির্মাণ হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে অন্তত ১ হাজার ২৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
সব মিলিয়ে, গাজায় হামলা বন্ধ হওয়াই বিদায়ী বছরের একমাত্র স্বস্তি। কিন্তু গাজা দখলের ‘হলুদ’ নকশা ও পশ্চিম তীরে দখলদারির বিস্তার ফিলিস্তিনিদের সামনে আরও একটি কঠিন বছরের আশঙ্কাই জাগিয়ে তুলছে।