বৃহস্পতিবার, 15 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

গণহত্যামূলক যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ইসরায়েলি নারীবাদ

চারজন ইসরায়েলি পাইলট যুদ্ধবিমানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের ভঙ্গি পরিচিত—ভাইজার নামানো, হাত ক্রস করা, যেন হলিউডের “টপ গান” ধাঁচের সামরিক দক্ষতার প্রদর্শন। তবে এই ছবির একটি বিশেষ দিক রয়েছে— চারজন পাইলটই নারী। হেলমেটের নিচ থেকে তাদের লম্বা চুল কাঁধে নেমে এসেছে। এই ছবি বহু বছর ধরে প্রচারিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র—ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিকের দিনগুলোতে এটি আবারও সামাজিক মাধ্যমে সামনে আসে।

গণহত্যামূলক যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ইসরায়েলি নারীবাদ
চারজন ইসরায়েলি মহিলা পাইলট যুদ্ধবিমানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে

চারজন ইসরায়েলি পাইলট যুদ্ধবিমানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের ভঙ্গি পরিচিত— ভাইজার নামানো, হাত ক্রস করা, যেন হলিউডের “টপ গান” ধাঁচের সামরিক দক্ষতার প্রদর্শন। তবে এই ছবির একটি বিশেষ দিক রয়েছে— চারজন পাইলটই নারী। হেলমেটের নিচ থেকে তাদের লম্বা চুল কাঁধে নেমে এসেছে।

এই ছবি বহু বছর ধরে প্রচারিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিকের দিনগুলোতে এটি আবারও সামাজিক মাধ্যমে সামনে আসে।

চলমান সামরিক অভিযানে নারী যুদ্ধবিমান পাইলটদের অংশগ্রহণ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য আত্মপ্রশংসার এক বড় উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে অনেক ইসরায়েলির কাছে এটি জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে।

ইরান ধ্বংসের অভিযানে নারী যুদ্ধবিমান পাইলটদের প্রশংসা, আর গাজায় নারীরা লড়ছে বেঁচে থাকার জন্য

সোমবার সামাজিক মাধ্যমে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, অপারেশন ‘রোরিং লায়ন’-এর অংশ হিসেবে ইরানের আকাশে পরিচালিত বিমান হামলায় পাইলট ও নেভিগেটরসহ প্রায় ৩০ জন নারী বিমান ক্রূ অংশ নিচ্ছেন।

এই বার্তাকে সমর্থন করেন বামপন্থী ডেমোক্র্যাট দলের নেতা ইয়ার গোলান। তিনি সামাজিক মাধ্যমে নারী ফাইটার পাইলটদের একটি ছবি শেয়ার করে লেখেন— “অপারেশন ‘লায়ন্স রোয়ার’-এর অংশ হিসেবে ইরানে জটিল হামলায় কয়েক ডজন নারী বিমান ক্রু সদস্যের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে সাহস, পেশাদারিত্ব এবং দেশপ্রেমের কোনো লিঙ্গ নেই।”

অনেক ইসরায়েলির কাছে এই বক্তব্যগুলো তাদের নিজেদের মূল্যবোধ—উদারপন্থা ও নারীবাদ—সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। তারা নিজেদের এই মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তুলে ধরতে চায় এবং যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তাদের বিপরীতে নিজেদের অবস্থানকে নৈতিকভাবে বৈধ হিসেবে দেখাতে চায়।

প্রতারণামূলক কাঠামো

স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট–এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, রাজনৈতিক বর্ণালীর বিস্তৃত অংশজুড়ে—বামপন্থী ও উদারপন্থী থেকে শুরু করে জোট সরকারের অতি-ডানপন্থী সমর্থক পর্যন্ত—৯০ শতাংশেরও বেশি ইহুদি ইসরায়েলি ইরানের ওপর সামরিক হামলাকে সমর্থন করেন।

রাস্তার সাক্ষাৎকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং টেলিভিশন বিতর্কে অনেক ইসরায়েলি নারী একই ধরনের যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, তারা বোমাবর্ষণের মধ্যেও থাকতে প্রস্তুত— যদি এর মাধ্যমে ইরানি জনগণ, বিশেষ করে ইরানি নারীরা, স্বাধীনতা অর্জনের সুযোগ পায়।

ইরানি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি ইয়াসমিন সায়েহ একটি নারীবাদী ফেসবুক গ্রুপে লিখেছেন— “আমি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে তোমাদের লিখছি। বাইরে বিস্ফোরণের শব্দ আমাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে—আমাদের এখানকার স্বাধীনতা আর ইরানের মানুষের স্বাধীনতার মধ্যে এক অদ্ভুত ও দুর্ভাগ্যজনক সম্পর্ক রয়েছে।”

রবিবার পালিত আন্তর্জাতিক নারী দিবস ইসরায়েলি সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এই বার্তা প্রচারের আরেকটি সুযোগ এনে দেয়।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলা হয়— “এই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরা সেই সব নারীদের স্বীকৃতি জানাই, যারা প্রতিটি মিশনকে সম্ভব করে তোলে।”

পোস্টটির সঙ্গে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যেখানে নারী পাইলট ও নেভিগেটরদের “ইরানের আকাশে নির্ভুলতা, মনোযোগ ও সাহসের সঙ্গে মিশন পরিচালনা” করতে দেখা যায়।

সেনাবাহিনীর প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যোদ্ধাদের মধ্যে ২১ শতাংশেরও বেশি নারী— যেখানে ২০১৫ সালে এই হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ।

সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়— “রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নারীরা আইডিএফে কাজ করে আসছেন এবং তাদের সেবা আমাদের লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আজও অপারেশন ‘রোরিং লায়ন’-এ তারা আইডিএফের কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ— সামনের সারি এবং হোম ফ্রন্ট উভয় ক্ষেত্রেই।”

রবিবার ইসরায়েলি বিরোধীদলীয় নেতা বেনি গ্যান্টজ সামাজিক মাধ্যমে একটি স্টাইলাইজড ছবি শেয়ার করেন। ছবিতে দেখা যায়, জ্বলন্ত আকাশরেখার ওপর দিয়ে একজন নারী ফাইটার পাইলট উড়ে যাচ্ছেন। সামনে কয়েকজন নারী প্রতিবাদ করছেন— একজন তার মাথার স্কার্ফ খুলে বাতাসে তুলেছেন, আরেকজন “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” লেখা একটি প্ল্যাকার্ড ধরে আছেন।

গ্যান্টজ লিখেছেন— “আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরা বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতা রক্ষা এবং এর জন্য লড়াই করা নারীদের সম্মান জানাই।”

ইসরায়েলি নেতারা প্রায়ই তেহরানের সঙ্গে সংঘাতকে ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরেন। এই বয়ানকে তারা বিশেষভাবে ইরানি নারীদের নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেন।

এক বছর আগে ইরানিদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া নারী নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের স্লোগান তুলে ধরেন। তিনি বলেন— “নারী, জীবন, স্বাধীনতা— এটাই ইরানের ভবিষ্যৎ।” তিনি ইরানিদের, বিশেষ করে নারীদের, তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার আহ্বান জানান।

এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলে সামরিকীকরণকৃত নারীবাদের একটি পরিচিত ধারা আবারও সামনে এসেছে— যেখানে যুদ্ধযন্ত্রে নারীর অংশগ্রহণকে সমতার প্রতীক হিসেবে উদযাপন করা হয়।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই তাদের নারীবাদী অগ্রগতির উদাহরণ তুলে ধরে। সেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্যও সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে যুদ্ধরত সৈন্যদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পোস্টগুলোতে প্রায়ই গাজা ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে নারী সৈন্যদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা চলাকালে সম্পূর্ণ নারী সদস্য নিয়ে গঠিত একটি ট্যাঙ্ক ক্রু “কয়েক ডজন হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করেছে”—এমন দাবি ইসরায়েলি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সম্প্রতি সেনাবাহিনী লেবানন সীমান্তে মোতায়েনের জন্য একটি নতুন পূর্ণাঙ্গ নারী যুদ্ধ ইউনিট গঠনের ঘোষণাও দিয়েছে।

‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’

চ্যানেল ১৪–এর একটি প্রতিবেদনে এক নারী পদাতিক কমান্ডারের সমালোচনার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র এফি ডিফ্রিন সামাজিক মাধ্যমে তার মেয়ের সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করেন। তার মেয়ে ইসরায়েলি নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। তিনি লেখেন— “যুদ্ধে নারীদের অবদান কোনো স্লোগান নয়; এটি একটি প্রমাণিত অপারেশনাল বাস্তবতা।”

তিনি আরও বলেন— “বছরের পর বছর ধরে, বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের পর থেকে নারী যোদ্ধারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের ভার বহন করেছে। তারা যোগাযোগ লাইনে কাজ করে, শত্রু সীমান্ত অতিক্রম করে, আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করে এবং গাজা, সিরিয়া, পশ্চিম তীর ও লেবাননে যুদ্ধ করেছে।”

তবে সমালোচকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর সংখ্যা এবং নারী ও মেয়েদের ওপর প্রতিদিনের সহিংসতার বাস্তবতার তুলনায় এই ধরনের বক্তব্য প্রায়ই ফাঁপা বলে মনে হয়।

গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ৩৩ হাজার নারী ও মেয়ে নিহত এবং ৭৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের বিশেষ দূত রিম আলসালেম ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অভিযোগ করেন যে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে “নারী-গণহত্যা” চালাচ্ছে। তিনি বলেন— “ফিলিস্তিনি নারী ও মেয়েদের সঙ্গে যা ঘটছে তা যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়। এটি ফিলিস্তিনি হওয়া এবং নারী হওয়ার কারণে তাদের জীবন ও দেহের ইচ্ছাকৃত ধ্বংস।”

বর্তমানে এক মিলিয়নেরও বেশি নারী ও মেয়ে গাজার ধ্বংসস্তূপ কিংবা তাঁবুতে বাস করছে, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটে। যেসব নারী আগে গৃহস্থালির কাজ সামলাতেন, তারা এখন প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ত্রাণের রান্নাঘরের লাইনে দাঁড়ান, দূর থেকে ভারী পাত্রে পানি বহন করেন, জ্বালানি কাঠ বা রান্নার উপকরণ সংগ্রহ করেন এবং একই সঙ্গে আহত শিশু ও বয়স্ক আত্মীয়দের দেখাশোনা করেন।

সহিংসতার ধরণ

ইসরায়েলি কারাগারে আটক বহু ফিলিস্তিনি নারী অভিযোগ করেছেন যে আটক অবস্থায় তারা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিছু নারী বলেছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আত্মীয় হওয়ার কারণে তারা নির্যাতন বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অন্যরা জানান, তাদের এবং তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা বা ধর্ষণের হুমকি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

একইভাবে আটক ফিলিস্তিনি পুরুষরাও জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের স্ত্রী বা কন্যাদের ধর্ষণের হুমকি দিয়ে মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।

আরেকটি উদ্বেগজনক ঘটনা হলো— ইসরায়েলি সৈন্যরা গাজার ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের অন্তর্বাস প্রকাশ্যে প্রদর্শন করে ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়। সমালোচকদের মতে, এর উদ্দেশ্য কেবল উপহাস নয়; বরং নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সীমা লঙ্ঘন করা।

সমালোচকদের প্রশ্ন— যারা নিজেদের “নারীদের মুক্তির দূত” বলে দাবি করে, তারা কীভাবে নারীদের ব্ল্যাকমেইল বা মানসিক নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে?

এদিকে ফিলিস্তিনি নারীরা যখন এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি, তখন ইসরায়েলি আইনপ্রণেতারা তাদের নিজস্ব নারী সৈন্যদের সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে গাজা যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্যরা দাবি করেন— নারী সৈন্যদের জন্য তাদের শরীর অনুযায়ী নকশা করা ইউনিফর্ম ও প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম সরবরাহ করা উচিত।

অন্যদিকে গাজার নারীরা তখন তাদের মৌলিক শারীরিক চাহিদার ওপরও আঘাতের মুখে পড়ছিলেন।

মাসের পর মাস ধরে স্যানিটারি প্যাডসহ মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রীর প্রবেশ সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফলে অনেক নারী ঋতুস্রাব নিয়ন্ত্রণে কাপড় বা শিশুর ডায়াপারের টুকরো ব্যবহার করতে বাধ্য হন।

গর্ভবতী নারী ও নবজাতকদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ইসরায়েলি হামলায় গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়— হাসপাতাল ও প্রসূতি ওয়ার্ড ধ্বংস হয়, স্বাস্থ্যকর্মীরা নিহত হন এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে প্রায় ২,৬০০ গর্ভবতী নারী গর্ভপাতের শিকার হন। সন্তান জন্ম দেওয়ার পরও অনেক মা অপুষ্টির কারণে বুকের দুধ দিতে পারেননি।

আরেকটি গাজা?

এই ধরণের পরিস্থিতি অন্য এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে।

লেবাননে মানবিক সংস্থা অ্যাকশনএইড সতর্ক করেছে যে দক্ষিণ লেবাননে সংঘাত তীব্র হওয়ায় হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে—যাদের মধ্যে গর্ভবতী নারী, শিশু ও নবজাতক রয়েছে।

ত্রাণ সংস্থা বাসমেহ ও জেইতুনেহ–এর প্রতিনিধি মারিয়ানা সামাহা বলেন— “নারী ও মেয়েদের বিশেষ চাহিদা রয়েছে। অনেক নারী গর্ভবতী বা স্তন্যদান করছেন। তারা তাদের শিশুদের নিয়ে পালিয়ে এসেছে। তাদের নিরাপদ আশ্রয়, স্বাস্থ্যবিধি কিট এবং মাসিক প্যাডের জরুরি প্রয়োজন।”

ইরানে, যেখানে এই সপ্তাহে ইসরায়েলের নারী যুদ্ধবিমান পাইলটরা অংশ নিয়েছেন, সেখানে নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ১,০০০ ছাড়িয়ে গেছে।

এর মধ্যে ১৬৫ জন শিশু, যাদের অধিকাংশই সাত থেকে বারো বছরের মেয়ে। তারা দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি স্কুলে বোমা হামলায় নিহত হয়। এই হামলার দায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কেউই স্বীকার করেনি, যদিও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে যে হামলাটি এমন একটি এলাকায় হয়েছিল যেখানে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালাচ্ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—যখন যুদ্ধেই এত তরুণীর প্রাণহানি ঘটছে, তখন কীভাবে ইরানি নারীদের মুক্ত করার কথা বলা যায়?

যে অভিযানের কথা মুক্তির অভিযান হিসেবে বলা হচ্ছে, সেই অভিযানের মধ্যেই বহু মানুষের জীবন ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। ইসরায়েলে নারীদের সামরিক অন্তর্ভুক্তিকে সমতার প্রতীক হিসেবে উদযাপন করা হলেও, সমালোচকদের মতে এই আলোচনায় যুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তবতা— বোমার নিচে থাকা বেসামরিক মানুষ আড়ালে চলে যায়।

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, এবং লেবানন ও ইরানে ধ্বংসযজ্ঞের স্বাভাবিকীকরণের মধ্যেই ইসরায়েলি নারীবাদের এই রূপ দেখা যায়— যেখানে নারী ও মেয়েরা একই সঙ্গে “মুক্তির প্রতীক” এবং যুদ্ধের শিকার।

গাজা ও ইরানে ব্যবহৃত কৌশল ও যুদ্ধের লক্ষ্যগুলোর মিল দেখে অনেকে আশঙ্কা করছেন— এই সংঘাতের ফলাফল ইরানকে আরেকটি গাজার মতো পরিস্থিতিতে ঠেলে দিতে পারে।

যদি তা ঘটে, তাহলে গাজার নারীরা ইতিমধ্যেই সেই ভবিষ্যতের মুখোমুখি হচ্ছেন, যার মুখোমুখি ইরানি নারীদেরও হতে পারে। একজন ফিলিস্তিনি নারী এই বাস্তবতাকে সংক্ষেপে এভাবেই প্রকাশ করেছেন— “তারা আমাদের অন্তত একশ বছর পিছিয়ে দিয়েছে।”


লেখক:

লুবনা মাসারওয়া — সাংবাদিক ও জেরুজালেমে অবস্থিত মিডল ইস্ট আইয়ের প্যালেস্টাইন-ইসরায়েল ব্যুরো প্রধান।

মাহা হুসেইনি — গাজায় বসবাসকারী পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী; ২০২০ সালে মার্টিন অ্যাডলার পুরস্কারপ্রাপ্ত।