গ্রিনল্যান্ড দখলের ইঙ্গিত দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কড়া বার্তা দিয়েছেন, তা ইউরোপকে স্পষ্টভাবেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সরাসরি সামরিক পাল্টা পদক্ষেপের ঘোষণা না এলেও ইউরোপীয় নেতারা দ্রুত বৈঠক ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার পথে হাঁটছেন। তবে ডেনমার্ক এক ধাপ এগিয়ে সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামরিক জবাবের কথাও প্রকাশ্যে জানিয়েছে।
ইউরোপীয় পর্যায়ে সংকট নিরসনে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ঘোষণা এসেছে, আগামী সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ডেনমার্কের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসন ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সতর্ক করেছেন—গ্রিনল্যান্ড জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা হলে ন্যাটো জোটের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়বে। পাশাপাশি দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, গ্রিনল্যান্ডে হামলা হলে সৈন্যরা তাৎক্ষণিকভাবে গুলি চালানোর অনুমতি পাবে, আলাদা নির্দেশের প্রয়োজন হবে না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, ফ্রান্স ও জার্মানি ইতোমধ্যে অন্যান্য ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও ফ্রান্স ও ইতালির ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহার নাও করতে পারে। তবু গ্রিনল্যান্ডে ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড দখলের ক্ষেত্রে ট্রাম্প কখনো ‘ভালো উপায়’, কখনো ‘কঠোর উপায়’-এর কথা বলেছেন। এতে পুরোনো মার্কিন উচ্চাকাঙ্ক্ষার পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে। বিশ শতকে ১০০ মিলিয়ন ডলারে দ্বীপটি কেনার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও, ট্রাম্পের নতুন আগ্রহকে হালকাভাবে দেখছে না ইউরোপ।
ভেনেজুয়েলা ও ইরানের উদাহরণ টেনে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করেছে—গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে আক্রমণাত্মক পথ নিতে তারা পিছপা হবে না। পলিটিকো এক ইইউ কূটনীতিকের বরাতে জানায়, ইউরোপ ট্রাম্পের মনোভাব বুঝে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং প্রয়োজনে সরাসরি সংঘর্ষের জন্যও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, “আমি সহজ উপায়ে একটি চুক্তি করতে চাই। যদি আমরা এটি সহজ উপায়ে না করি, তবে আমরা এটি কঠিন উপায়ে করব।” তিনি আরও দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় না গেলে চীন ও রাশিয়া সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
এই বক্তব্যের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশসহ আরও ছয়টি ইউরোপীয় রাষ্ট্র ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দেয়। তবে ট্রাম্পের সমালোচনায় কতটা কড়া ভাষা ব্যবহার করা হবে—সে বিষয়ে এখনো ঐক্যমত হয়নি।
ট্রাম্প মোকাবিলায় ইউরোপের পরিকল্পনা
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন-নোয়েল ব্যারোট পলিটিকোকে বলেন, “হুমকির ধরন বা উৎস যাই হোক, আমরা সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি।”
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াদেফুলও এমন একটি পরিকল্পনায় কাজ করছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণের চেষ্টা করলে ইউরোপীয় দেশগুলো একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডবাসীর স্পষ্ট বার্তা
গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের ধারণা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষায়, “আমরা আমেরিকান হতে চাই না, ডেনিশও হতে চাই না—আমরা গ্রিনল্যান্ডবাসী।” পার্লামেন্টের পাঁচটি দলের নেতারা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, দ্বীপের ভবিষ্যৎ গ্রিনল্যান্ডবাসীরাই নির্ধারণ করবে।
ইউরোপীয় মহলে ধারণা করা হচ্ছে, ডেনমার্ক ও ইইউর পক্ষ থেকে আকর্ষণীয় আর্থিক প্যাকেজ গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে দূরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইইউ বাজেট খসড়া অনুযায়ী, ২০২৮ থেকে সাত বছরে গ্রিনল্যান্ডে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ করে ৫৩০ মিলিয়ন ইউরো করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চীন ও রাশিয়াকে ঠেকানোর যুক্তি
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে পিটুফিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক সামরিক সদস্য মোতায়েন রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পরিচালিত এই ঘাঁটিতে চুক্তির আওতায় আরও সৈন্য পাঠানোর সুযোগ থাকলেও ট্রাম্পের দাবি, সেটি যথেষ্ট নয়। তাঁর ভাষায়, “গ্রিনল্যান্ড মার্কিন মালিকানায় থাকতে হবে। আমি চাই না চীন ও রাশিয়া এর নিয়ন্ত্রণ নিক—ন্যাটোকে বিষয়টি বুঝতে হবে।”