মঙ্গলবার, 27 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

হামে শিশুমৃত্যু ৪৫০ ছাড়াল, এক দিনে ঝরল ১২ প্রাণ

দেশে হাম ও এর তীব্র উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ক্রমাগত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এবং এর লক্ষণ নিয়ে আরও ১২টি শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।

হামে শিশুমৃত্যু ৪৫০ ছাড়াল, এক দিনে ঝরল ১২ প্রাণ
ছবি : সংগৃহীত

দেশে হাম ও এর তীব্র উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ক্রমাগত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এবং এর লক্ষণ নিয়ে আরও ১২টি শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মৃতদের মধ্যে চারজন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল এবং অবশিষ্ট আটজনের শরীরে রোগের তীব্র উপসর্গ বিদ্যমান ছিল। নতুন এই প্রাণহানির ফলে দেশজুড়ে এই রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫১ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত নিয়মিত বুলেটিনে এই উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১১১ জনের দেহে আনুষ্ঠানিকভাবে হাম শনাক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন এক হাজার ১৯২ জন, যাদের মধ্যে এক হাজার ১৬ জনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আক্রান্তদের ভৌগোলিক বিন্যাসে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ৪২২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে, আর সবচেয়ে কম সাতজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন রংপুর বিভাগে।

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৫৫ হাজার ৬১১ জনে, যার মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় সাত হাজার ৪২১ জনের শরীরে ভাইরাসের চূড়ান্ত উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত আড়াই দশকে দেশে হামের এমন ভয়াবহ প্রকোপ ও সংক্রমণ আর কখনো দেখা যায়নি। এর আগে ২০০৫ সালে দেশে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯৩৪ জন রোগী পাওয়া গিয়েছিল, যার পর থেকে সংক্রমণ ক্রমান্বয়ে কমে আসছিল। এমনকি গত ২০২৫ সালেও পুরো দেশে মাত্র ১৩২ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছিল, যা এবার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) থেকে প্রাপ্ত ৬০টি মৃত শিশুর তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে এক ভয়াবহ বাস্তবতা সামনে এসেছে। দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে অত্যন্ত কম বয়সী শিশু এবং নবজাতকদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। মৃত শিশুদের মধ্যে ২৯টিরই বয়স ছিল মাত্র ৩ থেকে ৮ মাসের মধ্যে, যার অর্থ তারা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হামের প্রথম প্রতিষেধক টিকা পাওয়ার বয়সেই পৌঁছাতে পারেনি। এছাড়া ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী ২১ জন, ১৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ৯ জন এবং ৯ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানে ৩১ জন ছেলে এবং ২৯ জন মেয়ে শিশু রয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টা সময়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকটময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট শিশুর প্রায় ৪০ শতাংশই মারা যাচ্ছে হাসপাতালে আসার প্রথম দুই দিনের মধ্যে। এর মাঝে ভর্তির দিনই ৫ জন, এক দিনের মাথায় ৯ জন এবং দ্বিতীয় দিনে আরও ৯ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় নিবিড় চিকিৎসায় থাকার পরও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৭ জন শিশু ১০ দিন বা তার বেশি সময় এবং একটি শিশু সর্বোচ্চ ৩৭ দিন ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে মারা গেছে। মৃত ৬০ শিশুর মধ্যে ৪৮ জনই ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়, যাদের মধ্যে ৩০ জনকেই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে গুরুতর অবস্থায় রাজধানীতে আনা হয়েছিল। এর মাঝে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই সর্বোচ্চ ১৫টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও বয়সসীমার এই উদ্বেগজনক সমীকরণ বিবেচনা করে দেশের জাতীয় টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি কমিটি হামের চিকিৎসা ও টিকাদান কর্মসূচিতে জরুরি পরিবর্তন এনেছে। বিশেষজ্ঞদের বিশেষ সুপারিশের ভিত্তিতে আগে যেখানে হামের প্রথম ডোজের বয়স ৯ মাস নির্ধারিত ছিল, তা কমিয়ে এখন ৬ মাস করা হয়েছে, যাতে অত্যন্ত কম বয়সী শিশুদের এই মরণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে দ্রুত সুরক্ষা প্রদান করা সম্ভব হয়।