বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে একক নির্ভরতা কমিয়ে আনতে একটি নতুন তেল পাইপলাইন নির্মাণ করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।
২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিকল্প পথে দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানির বিদ্যমান সক্ষমতা দ্বিগুণ হবে।
মিডলইস্ট আইয়ের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই মূলত আবুধাবি এই কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই সংঘাত শুরু হওয়ার পূর্বে সংযুক্ত আরব আমিরাত দৈনিক প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল তেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করত। তবে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর এবং নিজস্ব জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা চালু করায় আমিরাতের তেল রপ্তানি প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস পায়।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ওমান উপসাগরের কৌশলগত ফুজাইরাহ বন্দরকে সংযুক্তকারী এই নতুন পাইপলাইনের নির্মাণকাজ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অ্যাডনকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই মেগা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এবং ইতিমধ্যেই এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বর্তমানে আমিরাতের হাতে থাকা হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব। নতুন এই পাইপলাইনটি পুরোপুরি চালু হলে হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ এড়িয়েই দেশটি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের সমপরিমাণ তেল রপ্তানি সচল রাখতে সক্ষম হবে। একই সাথে ২০২৭ সালের মধ্যে নিজেদের দৈনিক তেল উৎপাদনের পরিমাণ ৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার দূরদর্শী লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে ইউএই।
চলমান সংঘাতের শুরুর দিকে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তেল সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেও নিজেদের রপ্তানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রেখেছিল। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেহরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
এদিকে চলতি মাসেই সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক জ্বালানি জোট ওপেক (OPEC) থেকে ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আবুধাবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত তাদের স্বাধীনভাবে তেল উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেবে।
মূলত তেল উৎপাদনের সীমা নির্ধারণ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই রিয়াদের সাথে আবুধাবির এক ধরনের নীতিগত মতবিরোধ চলছিল। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সৌদি আরব উৎপাদন সংকুচিত করার পক্ষে থাকলেও, আমিরাত তাদের বর্ধিত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেয়। এই উদ্দেশ্যেই দেশটি সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের জ্বালানি অবকাঠামো খাতে ব্যাপক পুঁজি বিনিয়োগ করেছে।
অবশ্য ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরানের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি হওয়ায় আমিরাতের এই নতুন পাইপলাইন ও অবকাঠামোগুলো এখনো চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। চলমান যুদ্ধের মাঝেও ইরানের ড্রোন হামলায় হাবশানের একটি গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ফুজাইরাহ বন্দরে হামলার জেরে সেখানে সাময়িকভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ তৈরির এই দৌড়ে কেবল আমিরাত একাই নয়, বরং সৌদি আরবও সমান্তরালভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে রিয়াদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল নিরাপদ রুটে রপ্তানির সুবিধা দিচ্ছে।