জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন জাপানি বিনিয়োগ এবং এর মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। তারেক রহমানের জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
দুই সরকারপ্রধান বড় বিনিয়োগ উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানান। টেকসই সরবরাহব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে তাঁরা একমত হন।
বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধান দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি উদ্যোগে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দুই নেতা। এর আওতায় উদীয়মান অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো, সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সহযোগিতার পরিধি বাড়ানো হবে।
দুই প্রধানমন্ত্রী এ উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর উন্নয়ন একযোগে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হন। পাশাপাশি শিল্পের মূল্য শৃঙ্খলের একটি বড় কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং বাণিজ্য ও সরবরাহের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে বিকশিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন।
উদ্যোগটির চারটি অগ্রাধিকার হলো যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নীতিনির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব উৎসাহিত করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
এ কাঠামোর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে বড় ধরনের লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে যৌথভাবে কাজ করবে দুই দেশ। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি দেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার গুরুত্বেও জোর দেন তাঁরা।
যোগাযোগ অবকাঠামো ও বন্দর উন্নয়ন
আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তাঁরা একমত হন।
এ ছাড়া ঢাকায় এমআরটি লাইনগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা। আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদার এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে ধারাবাহিকভাবে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন দুই নেতা।
বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ
বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তারেক রহমানের সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন তাকাইচি। আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান তিনি।
উৎপাদন, খাদ্য ও কৃষি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পে পরিপূরক ও টেকসই সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হন দুই প্রধানমন্ত্রী।
তাকাইচি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। জবাবে তারেক রহমান তাঁর সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন। উন্নত নীতিমালা, স্বচ্ছতা এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ প্রেরণ এবং লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়াতেও এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান দুই নেতা।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরকেও তাঁরা স্বাগত জানান। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে প্রতিশ্রুত ইয়েন ঋণ প্রকল্পটিকেও স্বাগত জানান দুই প্রধানমন্ত্রী।
ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতি বাড়াতে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পাঠানো এবং অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেন তাঁরা। জাপান-বাংলাদেশ যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) প্ল্যাটফর্ম এবং বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও মত দেন দুই নেতা।
বাণিজ্য চুক্তি ও শিল্পের বহুমুখীকরণ
জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তাঁরা।
এ চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পের বহুমুখীকরণে জোর দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন দুই নেতা। তাঁদের মতে, এর ফলে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া সহজ, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম হবে।
আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের অনুরোধ নিয়ে আরও আলোচনার অপেক্ষায় থাকার কথা জানান তাকাইচি। অবাধ, ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রাখার গুরুত্বও পুনর্ব্যক্ত করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহযোগিতা
জাপানের ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি সহায়তা ঋণ’ কর্মসূচির আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তার জন্য দেশটিকে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান।
‘পার্টনারশিপ অন ওয়াইড এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস রেজিলিয়েন্স এশিয়া’ বা ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় এটিই জাপানের প্রথম ইয়েন ঋণ প্রকল্প।
বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান কমাতে জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের অব্যাহত সমর্থনের কথা জানান তাকাইচি।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তেলের মজুত বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জ্বালানি উৎপাদনকারী ও ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ওপর জোর দেন দুই নেতা। জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা এবং নিরাপদ ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন, জ্বালানি দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান তাঁরা। বিদ্যমান পরিবেশগত সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় সরকারি-বেসরকারি সংলাপ আয়োজনের বিষয়টিও সমর্থন করেন।
ডিজিটাল রূপান্তর ও দক্ষ জনশক্তি
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ডিজিটাল রূপান্তর, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার নতুন সুযোগ অনুসন্ধানের গুরুত্ব স্বীকার করেন দুই নেতা।
মানবসম্পদের উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও তাঁরা একমত হন। এ সহযোগিতার আওতায় জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, টেকসই নগর উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তারেক রহমান সুশাসন, সামাজিক ও আর্থিক সহায়তা এবং ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়নে তাঁর সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরেন।
স্থানীয় সরকারগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ইয়েন ঋণ কর্মসূচির আওতায় ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ফেজ-২)’ প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানান দুই নেতা। মানসম্মত অবকাঠামো, স্বচ্ছ ও ন্যায্য উন্নয়ন অর্থায়ন, ঋণের স্থায়িত্ব এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার গুরুত্বও পুনর্ব্যক্ত করেন তাঁরা।
এ ছাড়া জাপানের আইনবিষয়ক কারিগরি সহায়তার আওতায় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর অভিপ্রায় পুনর্ব্যক্ত করেন তারেক রহমান ও তাকাইচি। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর ও কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানান তাঁরা। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় আরও অগ্রগতির আশাও প্রকাশ করেন দুই নেতা।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ হিসেবে ভূমিকার স্বীকৃতি দেন তাকাইচি। প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, উপকূলীয় টহল এবং বন্দর নিরাপত্তায় সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে জাপানের অঙ্গীকার জানান তিনি।
জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) কর্মসূচির আওতায় একটি টহল জাহাজ এবং সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহল নৌযান দেওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানান দুই প্রধানমন্ত্রী। সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানেও একমত হন তাঁরা।
গণতন্ত্র ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক পর্যালোচনা করে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং অবকাঠামো, জ্বালানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কৌশলগত অংশীদারত্বের অগ্রগতির প্রশংসা করেন দুই নেতা। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতিও তাঁরা অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
গত পাঁচ দশকে জাপানের ধারাবাহিক উন্নয়ন সহায়তা এবং বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিতে দেশটির অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারেক রহমান। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের প্রশংসা করেন তাকাইচি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানান তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান।
সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাবিষয়ক বিনিময়, জাপানি ভাষাশিক্ষা, জাপানবিষয়ক গবেষণা এবং জাপান সরকারের বৃত্তি কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে বিনিময় এবং তাঁদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও একমত হন তাঁরা।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমার সংকট
মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি, এর আঞ্চলিক নিরাপত্তাগত প্রভাব, বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তদেশীয় অপরাধ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। তাঁরা অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং রোহিঙ্গাসহ সব পক্ষ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংলাপের আহ্বান জানান।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাসহ বাস্তুচ্যুত মানুষকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন তাকাইচি। তাঁদের জন্য অব্যাহত মানবিক সহায়তায় জাপানের সমর্থনের কথাও জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, আর এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। রোহিঙ্গাসহ বাস্তুচ্যুত মানুষদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসই উপায়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়েই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব বলে একমত হন দুই নেতা।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা
মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত উত্তেজনা প্রশমন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবিলম্বে ও সম্পূর্ণভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী। অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই সব জাহাজের নিরাপদ ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্যের জন্য লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতার কৌশলগত গুরুত্ব স্বীকার করেন দুই নেতা। বেসামরিক জাহাজ ও নাবিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তাঁরা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সামুদ্রিক কর্মীদের জীবন বিপন্ন করতে পারে—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
গাজা পুনর্গঠনে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন দুই প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানসহ ফিলিস্তিন সমস্যার ন্যায়সংগত, স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তাঁরা।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনে প্রতিফলিত আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌ ও আকাশপথে চলাচলের স্বাধীনতা এবং সামুদ্রিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির গুরুত্বও পুনর্ব্যক্ত করেন দুই নেতা।
জাতিসংঘে সহযোগিতা ও পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ
বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাঁকে অভিনন্দন জানান তাকাইচি। আরও সক্ষম ও অভিঘাত মোকাবিলায় শক্তিশালী জাতিসংঘ গড়ে তুলতে তাঁর সঙ্গে সহযোগিতার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নিতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হন দুই নেতা। এ সংস্কারের আওতায় স্থায়ী ও অস্থায়ী—উভয় ধরনের সদস্যপদ বাড়ানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তারেক রহমান ও তাকাইচি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার অঙ্গীকার এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) বহাল রাখা ও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব লঙ্ঘন করে কোরীয় উপদ্বীপে পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা। পাশাপাশি অপহরণ সমস্যার অবিলম্বে সমাধানের আহ্বান জানান দুই নেতা।
বৈঠক শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি ও দেশটির জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য তাকাইচিকে আমন্ত্রণও জানান তিনি।