হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি পুনরায় সচল করতে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের জোর তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক গোপন নথিতে ‘ম্যারিটাইম ফ্রিডম কন্সট্রাক্ট’ নামক এই প্রস্তাবিত জোটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত তথ্য আদান-প্রদান, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে এই জোটের প্রধান লক্ষ্য। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চললেও তারা স্পষ্ট করেছে যে, সংঘাতের স্থায়ী অবসান হওয়ার পরই তারা এ প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত হবে।
দীর্ঘ দুই মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রবাহ বন্ধ রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। তেলের এই আকাশচুম্বী দাম বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দামকে রাজনৈতিকভাবে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত করেছে।
এদিকে, সংকট নিরসনের আলোচনা বর্তমানে গভীর অচলাবস্থায় নিমজ্জিত। তেহরান চায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকারকে স্বীকৃতি দিক এবং যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলে তবেই তারা আলোচনায় বসবে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতেই পারমাণবিক ইস্যুতে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা চাইছেন। এই অনড় অবস্থানের মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিফিং দেওয়ার কথা রয়েছে। উদ্দেশ্য হলো সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে বাধ্য করা। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হুঁশিয়ারি বার্তায় স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও বর্তমানে বেশ নাজুক। যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির মুদ্রার মান রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে গেছে এবং মাসিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ফলকার তুর্ক জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে অন্তত ২১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষ নেতৃত্বের প্রাণহানির পর দেশটিতে বর্তমানে কোনো একক নেতৃত্ব নেই। তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক বার্তায় জানিয়েছেন, অবরোধ বা চাপের মুখে তারা আত্মসমর্পণ করবেন না এবং ঐক্যবদ্ধভাবে এই ‘ষড়যন্ত্র’ মোকাবিলা করবেন।
পেন্টাগনের তথ্যমতে, এই যুদ্ধের ব্যয় ইতিমধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে মাসের পর মাস নৌ-অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। বর্তমানে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া পর্যবেক্ষণগুলোর বিষয়ে জবাব দেওয়ার জন্য তেহরান চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত সময় চেয়েছে। বিশ্ব এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে তেহরানের জবাব এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যার ওপর নির্ভর করছে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।