ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা দাবি করেছে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী কয়েকটি তেল ও জ্বালানি স্থাপনায় তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। তবে অন্যান্য হামলা বা এতে হতাহতের কোনো খবর এখনো নিশ্চিত করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ।
শনিবার রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি জ্বালানি সংরক্ষণ এলাকায় কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এর প্রভাব পড়ে বিমান চলাচলেও। কিছু সময়ের জন্য ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
গত জুলাই থেকে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হামলা জোরদার করার পর এই প্রথম রিয়াদে আবারও বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হলো।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান
হুথিদের হামলার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল এবং যাতায়াতে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে তারা।
এক বিবৃতিতে স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলেছে, "ইরান সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে, যার মধ্যে বেসামরিক বিমানবন্দরও রয়েছে। সামরিক এই সংঘাত দ্রুত আরও বড় আকার নিতে পারে।"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ওই অঞ্চলে ভ্রমণের পরিকল্পনা আমেরিকান নাগরিকদের গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
কয়েকটি হামলা প্রতিহত করার দাবি সৌদি জোটের
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ, তাইফ, ফারাসান ও ইয়ানবু শহরের দিকে এগিয়ে আসা কয়েকটি হামলা প্রতিহত করেছে।
অন্যদিকে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া আল-সারিয়া অনলাইনে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং ইয়ানবু শহরে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর কয়েকটি স্থাপনা লক্ষ্য করে তারা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে।
আল-সারিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের রাজধানী সানা শহরে সৌদি বাহিনীর চালানো হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই হামলা করা হয়েছে।
হুথিদের এই সামরিক মুখপাত্র আরও দাবি করেন, গত এক সপ্তাহে সৌদি আরব ইয়েমেনে প্রায় ৩০০টি হামলা চালিয়েছে।
লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনের এক লাখের বেশি মানুষ
ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরেই গৃহযুদ্ধ চলছে। সংঘাতের একদিকে রয়েছে হুথিরা, অন্যদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার। সৌদি আরব ইয়েমেনের ওই সরকারকে সমর্থন করে আসছে।
সাম্প্রতিক কয়েক মাসে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে তারা দাবি করেছে, ইয়েমেনে একটি সৌদি যুদ্ধবিমানও তারা ভূপাতিত করেছে।
এএফপির এক প্রতিবেদনে অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, শনিবার হুথি এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ৪৮ জন নিহত হয়েছেন। তবে নিহতের এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হুথিরা জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে তাদের ৩১ জন যোদ্ধা রয়েছেন। অন্যদিকে ইয়েমেন সরকারের পক্ষ থেকে ১৭ জন সেনা নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাত ও লড়াইয়ের কারণে ইয়েমেনে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৯৬ জনের বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
রিয়াদে আতঙ্ক
শনিবার রিয়াদে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর মধ্যেই কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বিমান চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়।
ফ্লাইটরাডার ২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় অনেক ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে পরিচালিত হয়েছে। পাশাপাশি কিছু ফ্লাইট বাতিলও করা হয়েছে।
এএফপির এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, আরামকোর একটি জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লেগেছিল। সে সময় দমকলকর্মীদের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
রিয়াদ এবং এর আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে হামলার বিষয়ে আগেই সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল। পরে শনিবার সকালে কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
রিয়াদের এক বাসিন্দা বলেন, "আমি সতর্কসংকেত শুনেছিলাম। এরপর আমার জানালা কেঁপে ওঠে। বিষয়টি খুবই ভয়ংকর ছিল। আমি এমন কিছু আশা করিনি।"
এদিকে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর মোকা এবং পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবিও করেছে হুথিরা।
এই অঞ্চল দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌযান চলাচল করে। একই সমুদ্রপথ সৌদি আরব তার তেল রপ্তানির ক্ষেত্রেও ব্যবহার করে।
হুথিদের দাবি, ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোর ওপর সৌদি আরব যে অবরোধ আরোপ করেছে, তার জবাব হিসেবেই তারা সমুদ্রপথে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
লোহিত সাগরের পথে বাড়ছে নির্ভরতা
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজগুলো এখন লোহিত সাগরের এই নৌপথের ওপর আগের তুলনায় আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী তেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলার হুথি দাবি সৌদি আরবের তেল পরিবহন ও রপ্তানি ব্যবস্থার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে।
এদিকে জেপি মরগান জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধের কারণে ভবিষ্যতে তেলের দাম কোন দিকে যাবে, তা অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
সূত্র: বিবিসি