মঙ্গলবার, 22 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে মালয়েশিয়া ও ফিলিপিন্সের আকাশ

সপ্তাহজুড়ে ভয়াবহ দাবানলে জ্বলছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া আগুন থেকে তৈরি ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া ইতোমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে মালয়েশিয়া ও ফিলিপিন্সের বিভিন্ন এলাকাতেও পৌঁছেছে। এতে জনস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।

ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে মালয়েশিয়া ও ফিলিপিন্সের আকাশ

সপ্তাহজুড়ে ভয়াবহ দাবানলে জ্বলছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া আগুন থেকে তৈরি ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া ইতোমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে মালয়েশিয়া ও ফিলিপিন্সের বিভিন্ন এলাকাতেও পৌঁছেছে। এতে জনস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।

দাবানলের ধোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল কুয়াশার মতো আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ঘন ধোঁয়ার কারণে একদিকে যেমন মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপের ইন্দোনেশীয় অংশ কালিমেন্টানের কয়েক লাখ মানুষ এরই মধ্যে এই বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছেন। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে, আগুন নিয়ন্ত্রণে ক্লাউড-সিডিং কিংবা উড়োজাহাজ ব্যবহার করে পরিচালিত অগ্নিনির্বাপণ অভিযানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশাল এলাকাজুড়ে ধোঁয়ার ঘন আস্তরণ থাকায় প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই আগুনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ।

আগুন নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় কয়েক হাজার কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

ইন্দোনেশিয়ায় সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম থাকে। এ সময়ে কৃষকেরা পাম অয়েল চাষ এবং পাল্প ও কাগজ উৎপাদনের জন্য জমি পরিষ্কার করতে প্রায়ই আগুন ব্যবহার করেন। জমি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে এটি সহজ একটি পদ্ধতি হলেও শুষ্ক আবহাওয়ায় আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়ে কালিমেন্টান ও সুমাত্রার সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও।

আগুন দিয়ে জমি পরিষ্কার করা ইন্দোনেশিয়ায় আইনত নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এই পদ্ধতি এখনও বন্ধ হয়নি। এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে দাবানল সাধারণত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। চলতি বছর একটি ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়া সরকারও স্বীকার করেছে, এসব আগুনের পেছনে ব্যক্তি ও করপোরেশনের ইচ্ছাকৃত ভূমিকা রয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রবোবো সুবিয়ান্তো সম্প্রতি জানিয়েছেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ইন্দোনেশিয়ায় শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের কারণে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরের মধ্যে ধোঁয়ার প্রভাব পড়া প্রতিবেশী দেশগুলোতেও স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের অংশ সারাওয়াকের বেশ কয়েকটি এলাকায় এয়ার পলুশন ইনডেক্স (আইপিআই) ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কালিমেন্টান থেকে আসা ধোঁয়া ক্রমেই ঘন হওয়ায় কুচিং, সামারাহান, সেরিয়ান, শ্রী আমান ও বেতোংয়ে সরাসরি ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে।

সারাওয়াকের বাসিন্দা মুহাম্মদ ফাজলি বেন্দাউদ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, কুয়াশা "দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।"

ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল চলতে থাকায় বায়ুদূষণের মাত্রার ওপর নজর রাখছে সিঙ্গাপুরও। বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির অনেক মানুষকে ২০১৩ ও ২০১৫ সালের ভয়াবহ দাবানলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই সময় সপ্তাহের পর সপ্তাহ পুরো সিঙ্গাপুর ধোঁয়ার কুয়াশায় ঢাকা ছিল।

সেই সময় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এমনকি ফাস্ট ফুড চেইনগুলোও হোম ডেলিভারি বন্ধ করে দিয়েছিল। পাশাপাশি বাজারে এন-৯৫ মাস্কের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।

পরবর্তী কয়েক বছর সিঙ্গাপুর এ ধরনের কুয়াশার বড় প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত ছিল। এর পেছনে ইন্দোনেশিয়ায় বার্ষিক দাবানলের মাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়।

তবে চলতি বছর ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে—এমন সতর্কবার্তায় নতুন করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে সিঙ্গাপুর। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও খুচরা বিক্রেতারা পর্যাপ্ত এন-৯৫ মাস্ক মজুদ করেছে। স্কুলগুলোও বাইরের কার্যক্রম কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে।

অক্টোবরের শুরুর দিকে লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে ফর্মুলা ওয়ান গ্র্যান্ড প্রিক্স। ধোঁয়াজনিত পরিস্থিতি বিবেচনায় এই বড় আয়োজনের জন্যও আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে মাস্কের মজুদ এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা প্রস্তুত রাখার বিষয় রয়েছে।

ফিলিপিন্সের দ্বীপ প্রদেশ পালাওয়ানেও ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়ার প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। সেখানকার চিকিৎসক ডা. প্রেশিয়াস বানাস-মেলাড জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে তার স্বামী ও ফুফাতো ভাইয়ের চোখ, নাক এবং গলায় চুলকানি দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, "আমরা এখন হালকা মাথাব্যথারও মুখোমুখি হচ্ছি। আমার ফুফাতো ভাই, যার কোনো কিছুতেই এলার্জি নেই, তার এলার্জি দেখা দিতে শুরু করেছে। আমার স্বামীই প্রথম ব্যক্তি যার চোখ ও গলায় চুলকানি শুরু হয়েছিল।"

গত সপ্তাহে বালাবাক শহরের আকাশে তিনি কুয়াশা দেখতে পেয়েছিলেন। তবে মঙ্গলবার পরিস্থিতি আরও ঘন হয়ে ওঠে। তার ভাষায়, "যেন কুয়াশা এখন আমাদের ঠিক সামনেই এসে উপস্থিত হয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, "রবিবার একটি পোড়া গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। পোড়া গন্ধটি আমাদের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে আসছে ভেবে আমরা আমাদের টেলিভিশন, কফি মেকার এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতিগুলোর প্লাগ খুলে ফেলেছিলাম। কিন্তু ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে দেখলাম যে এটি মূলত ইন্দোনেশিয়ার বনের আগুনের গন্ধ।"