ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা নজিরবিহীন সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি, ২০২৬) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা প্রথমবারের মতো এই বিপুল প্রাণহানির তথ্য স্বীকার করেছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একেই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ইরানি কর্মকর্তা নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করলেও মৃতদের মধ্যে সাধারণ নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য কতজন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান দেননি। তবে তিনি এই প্রাণহানির জন্য ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করে দাবি করেছেন যে, তারা আন্দোলনকে সহিংস করতে উভয় পক্ষকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। মূলত দেশের চরম অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যের প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজার এলাকা থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, যা দ্রুতই রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো এই সহিংসতাকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'এইচআরএএনএ' জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৮৫০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৩৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছে। এছাড়া প্রাণ হারানোদের মধ্যে অন্তত ৯ জন শিশু রয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। আন্দোলনের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে ইরান সরকার দেশজুড়ে দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট পরিষেবা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে রাখায় এবং যোগাযোগের ওপর কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করায় দীর্ঘ সময় হতাহতের প্রকৃত চিত্র আড়ালে ছিল। তবে সম্প্রতি তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের মর্গ ও হাসপাতালের ভিডিও ফুটেজ সামনে আসার পর এই বিপুল মৃত্যুর খবর জানাজানি হয়।
ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব এই আন্দোলন মোকাবিলায় বর্তমানে দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে। একদিকে তারা অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে জনগণের প্রতিবাদকে ‘যৌক্তিক’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে রাজপথে কঠোর দমন-পীড়ন ও নজিরবিহীন টিয়ারশেল ও গুলি বর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। তেহরান এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে বলেছে, বিদেশি মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে ব্যবহার করে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। রয়টার্স কর্তৃক যাচাইকৃত ভিডিওগুলোতে রাতের অন্ধকারে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ এবং সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য ধরা পড়েছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।