মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে গত জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
আজ বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অন্যতম প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সর্বশেষ পাল্টাপাল্টি হামলার পর উত্তেজনা আরও বাড়ায় তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়। তবে পরে দাম কিছুটা কমে আবার ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌযানে হামলার চেষ্টা করার পর দেশটির কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ ‘ধ্বংস’ করার কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
এর আগে ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের চারটি শহরে হামলা চালায়। এসব হামলায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। একই সময়ে কয়েকটি তেল স্থাপনাতেও আগুন ধরে যায়।
আগস্ট থেকে তেলের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ
চলতি আগস্টের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত স্থায়ীভাবে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসা এবং নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হওয়ায় জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও তীব্র হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে গত ছয় মাস ধরে তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ–সংকট তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বড় শঙ্কা
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম দফায় হামলা শুরু করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তখন বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
সংঘাতের ধারাবাহিকতায় এপ্রিলে তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে ওঠে। পরে ওই অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা দেখা দিলে দাম কমতে শুরু করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা স্মারক ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আবারও তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়।
গ্যাসের বাজারেও প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অভিঘাত শুধু তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; প্রভাব পড়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও। চলতি মাসে যুক্তরাজ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মূল্যস্ফীতি ও সুদহার নিয়ে নতুন উদ্বেগ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছর সুদের হার বাড়ানোর আশঙ্কাও আরও জোরালো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদেরা ধারণা করছেন, বছরের শেষ নাগাদ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ অন্তত একবার সুদের হার বাড়াতে পারে।
ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বৃদ্ধির সঙ্গে তেলের বাজারের একটি পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। সুদের হার বাড়লে ঋণ নেওয়ার ব্যয় বেড়ে যায়। এতে বিনিয়োগ ও ভোগ কমতে পারে এবং এর প্রভাব পড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে গেলে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা তেলের দামের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে সুদের হার বাড়ানো হলে ডলারের মূল্য শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে আমদানিকারকদের জন্য তেল কেনার ব্যয় ও চাপ বাড়ে। আবার তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়লে ফেডারেল রিজার্ভ আরও সুদহার বাড়ানোর পথে যেতে পারে। আর সুদহার বাড়লে অর্থনীতিতে চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।