দেশে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোবাইল সিগন্যাল দুর্বল হয়ে পড়ায় সাধারণ গ্রাহকদের দৈনন্দিন যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র
ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার বাসিন্দা মো. মোশাররফের মতো হাজারো গ্রাহক এখন ফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়াকে একটি সংগ্রাম হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, দিনে পাঁচ ঘণ্টারও কম সময় বিদ্যুৎ পাওয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অধিকাংশ সময় বিচ্ছিন্ন থাকে। এই সমস্যা এখন আর কেবল প্রত্যন্ত গ্রামেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং শহর অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে।
সংকটের মূল কারণ
টেলিকম অপারেটর ও টাওয়ার কোম্পানিগুলোর মতে, নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের পেছনে প্রধানত দুটি কারণ দায়ী:
১. বিদ্যুৎ বিভ্রাট: মোবাইল টাওয়ারগুলোতে থাকা ব্যাটারি ব্যাকআপ সাধারণত ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা সেবা দিতে পারে। কিন্তু লোডশেডিং এর চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় ব্যাটারি পুনরায় চার্জ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
২. জ্বালানি সংকট: বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে তা চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে স্থায়ী জেনারেটর সুবিধা না থাকা সাইটগুলোতে বহনযোগ্য জেনারেটর পৌঁছানো এবং তাতে তেল সরবরাহ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতীয় অবকাঠামো ও ঝুঁকির মাত্রা
সারাদেশে প্রায় ৪৬,৫৬৭টি টাওয়ার এবং ২৭টি গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টার রয়েছে, যা ১৮ কোটিরও বেশি গ্রাহককে সেবা দেয়। তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে দেশের অন্তত ১২টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ৯৩% থেকে কমে ৭৭%-এ নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ টাওয়ারকো অ্যাসোসিয়েশনের অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি সুনীল আইজ্যাক সতর্ক করে বলেছেন, "টেলিযোগাযোগ খাত দেশের অর্থনীতির ভিত্তি। জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি বরাদ্দে এই খাতকে অগ্রাধিকার না দিলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জরুরি সেবাগুলো অচল হয়ে পড়বে।"
অপারেটরদের উদ্বেগ ও পদক্ষেপ
অপারেটররা জানিয়েছেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সচল রাখতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও অকটেন প্রয়োজন।
বিটিএস (BTS): প্রতিদিন অপারেটরভেদে ৫২,০০০ লিটারের বেশি ডিজেল ব্যবহার হচ্ছে। ডেটা সেন্টার: প্রতিটি কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ৪,০০০ লিটার ডিজেল লাগছে।
রবি আজিয়াটা, গ্রামীণফোনসহ শীর্ষস্থানীয় অপারেটররা ইতিমধ্যে বিটিআরসি-কে চিঠির মাধ্যমে অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে। তারা বলছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের অগ্রাধিকার নিশ্চিত না হলে ব্যাপকভাবে কল ড্রপ এবং ইন্টারনেট বিভ্রাট এড়ানো সম্ভব হবে না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারি জানিয়েছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিষয়টি নিয়ে টেলিযোগাযোগ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করছে। জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) সাথে জরুরি বৈঠকের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও জনগণের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে টেলিযোগাযোগ খাতকে 'জরুরি সেবা' হিসেবে বিবেচনা করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: ডেইলি স্টার