শনিবার, 24 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর, এখনো মেলেনি ক্ষতিপূরণ

১৯৯৭ সালের ১৪ জুনের সেই ভয়াবহ রাত আজও ভুলতে পারেনি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মাগুরছড়া এলাকার মানুষ। মধ্যরাতে ফুলবাড়ী চা-বাগানসংলগ্ন এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান কূপে খননকাজ চলার সময় ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই আগুনের বিশাল শিখা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, আতঙ্কে থমকে যায় পুরো এলাকা। উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের আশার জায়গায় নেমে আসে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা।

মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর, এখনো মেলেনি ক্ষতিপূরণ

১৯৯৭ সালের ১৪ জুনের সেই ভয়াবহ রাত আজও ভুলতে পারেনি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মাগুরছড়া এলাকার মানুষ। মধ্যরাতে ফুলবাড়ী চা-বাগানসংলগ্ন এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান কূপে খননকাজ চলার সময় ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই আগুনের বিশাল শিখা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, আতঙ্কে থমকে যায় পুরো এলাকা। উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের আশার জায়গায় নেমে আসে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের ২৯ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ ১৪ জুন। দেশের অন্যতম বড় শিল্প ও পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত এই দুর্ঘটনার প্রভাব এখনও অনুভব করছেন স্থানীয় মানুষ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য।

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিস্ফোরণের জন্য দায়ী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টালের কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকার বা ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। ফলে মাগুরছড়া ট্র্যাজেডি এখনও পরিবেশ ধ্বংস, ক্ষতিপূরণ আদায় ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নে আলোচিত একটি ঘটনা হয়ে রয়েছে।

১৯৯৭ সালের ওই বিস্ফোরণে শুধু গ্যাসকূপই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; ধ্বংসের মুখে পড়ে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, চা-বাগান, রেললাইন, সড়ক, বিদ্যুৎ ও গ্যাস অবকাঠামো। আগুনে মারা যায় অসংখ্য বন্যপ্রাণী ও পাখি। কয়েক মাস ধরে জ্বলতে থাকা আগুনে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে উত্তোলনযোগ্য প্রায় ২৪৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আগুনে পুড়ে যায়, যার আর্থিক মূল্য হাজার হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি পরিবেশ ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও ছিল ব্যাপক, যা দেশের বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। আগুনের তীব্র তাপে হাজার হাজার গাছ পুড়ে যায় এবং নষ্ট হয় বহু প্রাণীর আবাসস্থল। পরিবেশবিদদের মতে, জীববৈচিত্র্যের এই ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন। দীর্ঘমেয়াদেও এর প্রভাব বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর রয়ে গেছে।

ঘটনার কারণ নিয়েও শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে। জাতীয় তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, খননকাজে নিরাপত্তার ঘাটতি, দায়িত্বে অবহেলা ও অনভিজ্ঞতার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় আন্দোলনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানির জবাবদিহি এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে আসছেন।

তাদের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোম্পানি নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করলেও বাংলাদেশ এখনো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

বিস্ফোরণের পর স্থানীয় জনগণ প্রতিবাদে রাজপথে নামে। বিক্ষোভ, মানববন্ধন, পদযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ ও বিচারের দাবি অব্যাহত রাখা হয়। প্রতি বছর ১৪ জুন মাগুরছড়া ট্র্যাজেডি দিবস হিসেবে পালন করা হয় এবং নতুন করে সামনে আসে ক্ষতিপূরণ ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি।

মাগুরছড়ার আগুন বহু আগেই নিভে গেলেও ক্ষতিপূরণ, জবাবদিহি ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠন ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং ঘটনার দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছে।

তাদের মতে, মাগুরছড়া দুর্ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে থেকে যাবে।