ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আশ্বাস দিয়েছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা এবং একই সাথে এই পরিবর্তনের রুপরেখাও তুলে ধরা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে। কিন্তু ইরানের শাসনব্যবস্থার কাঠামো এবং প্রকৃত শক্তিমত্তা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মোসাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় যেকোনো সময় যুদ্ধ থেকে বের হয়ে যেতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোসাদ ইরানে সরকার পতনের সম্ভাবনা তুলে ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-কে আশ্বস্ত করেছিল, যা পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-কে বোঝাতে সহায়ক হয়।
এনওয়াইটি জানায়, ইরানের অভ্যন্তরে গণবিক্ষোভ উসকে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা ছিল মোসাদের, যার মাধ্যমে সরকার পতন ঘটানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর কয়েকদিন আগে মোসাদের প্রধান ডেভিড বারনিয়া নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ওয়াশিংটন সফরকালে বারনিয়া মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও একই প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তা এবং ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এ পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ ছিল, তবুও শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প এতে সম্মতি দেন।
মার্কিন ও ইসরায়েলি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সরকারকে উৎখাত করা সম্ভব—এই বিশ্বাসটি ট্রাম্পের কাছে প্রতিষ্ঠা করতে মোসাদের আশ্বাসগুলো ব্যবহার করেছিলেন নেতানিয়াহু।
পরিকল্পনার খসড়া অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ইরানি নেতাদের লক্ষ্য করে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করা হবে। এরপর ধারাবাহিক গোয়েন্দা অভিযান চালিয়ে "শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে ধারাবাহিক গোয়েন্দা অভিযান" পরিচালনা করা হবে। মোসাদের ধারণা ছিল, এতে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে ফল বয়ে আনবে।
যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্যেও এই পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা যায়। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন: “অবশেষে, ইরানের মহান, গর্বিত জনগণকে আমি আজ রাতে বলছি যে, আপনাদের স্বাধীনতার সময় আসন্ন… আমাদের কাজ শেষ হলে, আপনাদের সরকার দখল করে নিন। এটি আপনাদেরই হবে। সম্ভবত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটাই হবে আপনাদের একমাত্র সুযোগ।”
তবে খুব দ্রুতই এই ‘শাসন পরিবর্তন’ আলোচনা গুরুত্ব হারায়। যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে মার্কিন সিনেটররা এক ব্রিফিং শেষে জানান, ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করা এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল না এবং এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও ছিল না।
এদিকে সিআইএ-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের সরকারকে সহজে উৎখাত করা সম্ভব নয়। বরং দেশটির নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে আরও কঠোরপন্থী শক্তি ক্ষমতায় আসতে পারে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্লেষণেও ইরান সরকারকে দুর্বল হলেও স্থিতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
মোসাদের প্রতি নেতানিয়াহুর ক্ষোভ
প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত বিস্তারের প্রস্তুতিতে একটি বড় ভুল ছিল এই ধারণা—যে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান উসকে দিতে পারবে।
যদিও নেতানিয়াহু এখনো ইরানে সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী, তবে মোসাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় তিনি হতাশ বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এক নিরাপত্তা বৈঠকে তিনি নাকি সতর্ক করেছিলেন, যদি গোয়েন্দা অভিযান ফলপ্রসূ না হয়, তাহলে ট্রাম্প যেকোনো সময় যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারেন।
এনওয়াইটি আরও জানায়, মোসাদের এই পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমানের বিশ্লেষকরাও দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। মার্কিন সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন, বোমা হামলার সময় ইরানের জনগণ রাস্তায় নেমে আসবে না, এবং গোয়েন্দা মূল্যায়নেও বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনা কম বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।