প্রকৃতির রুদ্রমূপে ম্লান হয়ে গেছে হাওরাঞ্চলের কৃষকের হাসি। খরা দিয়ে শুরু হওয়া বোরো মৌসুমের শেষটা হচ্ছে সর্বনাশা বৃষ্টি আর অকাল বন্যায়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে সোনালি ধানের শিষ এখন পানির নিচে। ঘরে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে ফসলের এই বিনাশ কেবল হাওরের কৃষকদেরই নয়, বরং পুরো দেশের খাদ্য মজুতকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
পানির নিচে সুনামগঞ্জের অর্ধেকের বেশি ধান
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। সরকারি হিসাবে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার শিকার হলেও কৃষকদের দাবি অনুযায়ী ক্ষতির পরিমাণ ২০ হাজার হেক্টর ছাড়িয়ে গেছে।
মোট আবাদ: ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর।
কাটা হয়েছে: ১ লাখ ৬ হাজার ৫২৯ হেক্টর।
বাকি আছে: ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৮২ হেক্টর।
অর্থাৎ, এখনো জেলার অর্ধেকের বেশি ধান মাঠেই রয়ে গেছে। শ্রমিকের অভাব এবং টানা বর্ষণে কাটা ধান শুকানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন দিরাই ও বিশ্বম্ভরপুরের কৃষকরা। অনেকে অর্ধেক ভাগ দেওয়ার শর্তেও ধান কাটার মানুষ পাচ্ছেন না।
অন্যান্য জেলার চিত্র:
হাহাকার কাটছে না কোথাও সুনামগঞ্জের পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জেও পানি বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা দিশেহারা।
জেলাগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান—
কিশোরগঞ্জে মোট আবাদের অর্ধেকের বেশি (প্রায় ৬৫%) ধান এখনো মাঠেই। ইটনা-মিঠামইনের হাজারো কৃষক ফসল হারিয়ে নির্বাক।
নেত্রকোনা ২২১৫ হেক্টর জমির ধান সরাসরি পানির নিচে। মোহনগঞ্জের কৃষকরা স্তূপ করে রাখা ধান পচে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
হবিগঞ্জে চার উপজেলার প্রায় ২৭১০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত। ২৪ ঘণ্টায় ১২৫ মিমি বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। মৌলভীবাজার হাওর এলাকায় ৮৩% ধান কাটা হলেও নন-হাওর এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে নেই কোনো সুখবর
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ৩-৪ দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ভারতের চেরাপুঞ্জির তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি। সুনামগঞ্জ ও সিলেটে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে বন্যার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
দিরাইয়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সাইফুল ইসলাম জানায়, "হাওরে বারো আনা ধানই কাটার বাকি। আগে ডুবরায় খাইছে, এখন যেইভাবে বৃষ্টি হইতাছে, বাকি ধান বন্যার পানিতে ডুইব্যা যাইব।"
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কৃষকদের ভেজা ধান সরাসরি অটো রাইস মিলে বিক্রির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং পলিথিন দিয়ে না ঢেকে উঁচু স্থানে ধান রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কৃষকের স্বপ্ন যখন দুঃস্বপ্ন
মাঠভরা পাকা ধান দেখে যারা ঋণের টাকা শোধ করার বা ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানোর স্বপ্ন বুনেছিলেন, পাহাড়ি ঢল তাদের সেই সম্বলটুকুই কেড়ে নিল। কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার কৃষকদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছে বাতাস। ড. মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান (উপপরিচালক, কিশোরগঞ্জ কৃষি বিভাগ) জানান, মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।