নিজেদের দীর্ঘদিনের পরমাণু নীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১২টি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় মোতায়েন করেছে ভারত।
বৈশ্বিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই স্পর্শকাতর সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি বিশদভাবে প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক অস্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থা এসআইপিআরআই তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে উল্লেখ করেছে, নয়াদিল্লির এই সিদ্ধান্ত তাদের কয়েক দশকের প্রতিষ্ঠিত সামরিক কৌশল থেকে এক বিশাল সরে আসা। এর আগে দেশটি সবসময় পারমাণবিক অস্ত্র এবং তা বহনের জন্য ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র বা যানগুলোকে সম্পূর্ণ আলাদা স্থানে কঠোর সুরক্ষায় সংরক্ষণ করত।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারই প্রথম ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রাগারকে কেবল ‘মজুত’ হিসেবে না রেখে সরাসরি ‘কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুত’ বা সক্রিয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাটির নিচে তৈরি বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো এবং আধুনিক পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোতে উৎক্ষেপণের জন্য তৈরি এই অস্ত্রগুলোর অবস্থান মূলত দেশটির উচ্চ সামরিক সতর্কাবস্থারই জানান দেয়।
প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, এই ১২টি নতুন ওয়ারহেডকে ভারত সরাসরি তাদের মূল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র বা উৎক্ষেপণ যানের সাথে যুক্ত করেছে অথবা সামরিক বাহিনীর সক্রিয় অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলোতে মোতায়েন করেছে। এর আগে গত বছর ভারতের একটি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিনে স্বল্পসংখ্যক ওয়ারহেড যুক্ত করে সমুদ্রে বিশেষ নজরদারি চালানোর প্রমাণ মিলেছিল। একই সাথে দেশটির মোট পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যাও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের হাতে থাকা মোট পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা আনুমানিক ১৯০টিতে গিয়ে ঠেকেছে, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। এই সমরাস্ত্রগুলো মূলত আকাশপথ, স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা সাবমেরিনের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী ত্রিমাত্রিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করে রেখেছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে এই ধারণাই প্রচলিত ছিল যে, শান্তিকালীন পরিস্থিতিতে ভারত কখনই তাদের পারমাণবিক অস্ত্রগুলো উৎক্ষেপণ যন্ত্রের সাথে যুক্ত করে রাখে না। কিন্তু বর্তমান সময়ে ক্যানিস্টারে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ এবং গভীর সমুদ্রে সার্বক্ষণিক মহড়া চালানোর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে শান্তিকালীন সময়েই ভারত কিছু যুদ্ধাস্ত্রকে যেকোনো মুহূর্তে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখছে।
অবশ্য ভারতের মূল পরমাণু নীতি এখনও ‘আগে ব্যবহার নয়’ এই দর্শনের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ, দেশটি কখনোই নিজে থেকে প্রথমে কোনো রাষ্ট্রের ওপর পারমাণবিক হামলা চালাবে না। তবে ভারতের মূল ভূখণ্ডে বা বিশ্বের কোথাও তাদের বাহিনীর ওপর যদি কোনো পরমাণু আক্রমণ হয়, তবে তার বিধ্বংসী জবাব দিতে তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। ভারতের এই বিশাল সামরিক প্রস্তুতি কোনো দেশের সাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লড়ার জন্য নয়, বরং শত্রুভাবাপন্ন শক্তির সম্ভাব্য যেকোনো আগ্রাসী মনোভাবকে শুরুতেই দমিয়ে রাখার একটি কার্যকর কৌশল।