শনিবার, 7 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

সাতাত্তর বছরের আওয়ামী লীগ সংকটে বিপর্যস্ত, কী করছে দলটি?

বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ তার প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বছর অতিক্রম করছে এক নজিরবিহীন ও চরম বৈরী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। সুদীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থাকার পর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতার অবসান এবং পরবর্তী সময়ে দলগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে দলটি এখন তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

সাতাত্তর বছরের আওয়ামী লীগ সংকটে বিপর্যস্ত, কী করছে দলটি?
ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ তার প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বছর অতিক্রম করছে এক নজিরবিহীন ও চরম বৈরী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে।

সুদীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থাকার পর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতার অবসান এবং পরবর্তী সময়ে দলগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে দলটি এখন তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

বিগত প্রায় দুই বছর ধরে দেশে দলটির সব ধরনের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড আইনিভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রথাগত উপায়ে বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে ব্যর্থ হয়ে দলটি এখন কেবল ঝটিকা মিছিল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তবে এ ধরনের সীমিত তৎপরতার মধ্যেই সারা দেশে দলটির নেতাকর্মীদের আটক হওয়ার প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে কখনোই এমন বিপর্যস্ত ও কোণঠাসা অবস্থায় পড়তে হয়নি। প্রথমে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের জারি করা একটি বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে দলটির সার্বিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও বিশেষ সতর্কতা জারি করার বিষয়টি দলটির বর্তমান রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাকেই বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

অবশ্য এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে গোপনে বা আকস্মিকভাবে সংগঠিত হওয়ার এক ধরনের চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে আচমকা মিছিল বের করার পাশাপাশি দলটির সমর্থকেরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে বেশ সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।

তবে দলটির নির্বাসিত ও আত্মগোপনে থাকা নেতারা দাবি করেছেন, বাইরে থেকে যা দেখা যাচ্ছে তা তাদের মূল সাংগঠনিক তৎপরতার খুব সামান্য অংশ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সাবেক সংসদ সদস্য বিপ্লব হাসান পলাশ এ প্রসঙ্গে জানান, দলের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড এখনো তৃণমূলের সাথে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দলের প্রথম সারির অধিকাংশ নেতা বর্তমানে কারাবন্দি অথবা দেশের বাইরে থাকায় একটি নতুন সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। শীর্ষ পদের শূন্যতা পূরণে নতুন মুখ নিয়ে আসা এবং জেলা-উপজেলা স্তরে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের কাজ চলছে। আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধার এবং দলের শীর্ষনেত্রীকে পুনরায় দেশে ফিরিয়ে আনাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতা কিংবা পূর্ববর্তী দীর্ঘ শাসনামলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এখনো কোনো ধরনের অনুশোচনা বা আত্মসমালোচনার মনোভাব দেখা যায়নি। দলটির এই অনমনীয় অবস্থান ভবিষ্যতে দেশের মূলধারার রাজনীতিতে তাদের প্রত্যাবর্তন এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে, মাঠপর্যায়ের দৃশ্যমান অনুপস্থিতি এবং কেবল ইন্টারনেট ভিত্তিক সক্রিয়তার ওপর ভর করে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কতটা সুবিধা আদায় করতে পারবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষক মহলে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আইনি নিষেধাজ্ঞা, তীব্র নেতৃত্ব সংকট এবং জনবিচ্ছিন্নতার এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিয়ে দলটি কীভাবে আবার দেশের রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।