বৃহস্পতিবার, 22 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন রংপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রানী

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ প্রান্তে এসে বড় সিদ্ধান্ত নিলেন রংপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি আনোয়ারা ইসলাম রানী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন রংপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী  রানী

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ প্রান্তে এসে বড় সিদ্ধান্ত নিলেন রংপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি আনোয়ারা ইসলাম রানী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রংপুর নগরীর নূরপুর এলাকায় ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত জানান রানী।

সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, “হিজড়া জনগোষ্ঠীসহ সকল সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের দাবিতে আমি রংপুর-৩ আসন থেকে আমার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিচ্ছি।” একই সঙ্গে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপটে হরিণ প্রতীকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান।

নিজের সিদ্ধান্তকে ঘিরে কোনো ধরনের অস্থিরতা না ছড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, “সকল রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, তাদের সমর্থক এবং আমার নির্বাচনী কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি, আমার এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যেন কোথাও কোনো ধরনের উত্তেজনা, সংঘাত বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। আমরা শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশে বিশ্বাস করি।”

কারো সঙ্গে আপোষ বা সমঝোতার অভিযোগ নাকচ করে রানী বলেন, “আমাকে ভুল বুঝবেন না, কষ্ট পাবেন না। আপনাদের রানী কারো কাছে বিক্রি হয় না, কারো সঙ্গে আপোষ করে না। এটি কোনো বিদায় নয়; এটি বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ়, নীতিগত ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান।” একই সঙ্গে তিনি তার দাবির পক্ষে সংহতি জানিয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান, যাতে হিজড়া জনগোষ্ঠীসহ সকল প্রান্তিক মানুষের জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায় সম্ভব হয়।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবস্থান তুলে ধরে রানী বলেন, “সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের প্রত্যাশিত পরিবর্তন এখনও হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “আমি এই শব্দটিকে সমর্থন করি না। আমরা পিছিয়ে পড়া নই, পিছিয়ে রাখা।” মূলধারায় মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণই তাদের লক্ষ্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের কাছে এবং জুলাই জাতীয় সনদের ভবিষ্যৎ পথরেখা প্রণয়নের আগেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন হলো এমন একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে জাতীয় সংসদে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়।”

নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ইতিহাস তুলে ধরে এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, “১৯৭৩ সালে যেখানে ১৫টি সংরক্ষিত আসন ছিল, তা পর্যায়ক্রমে বেড়ে আজ ৫০টিতে পৌঁছেছে।” তবে এসব আসনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “নারীদের পাশাপাশি হিজড়া সম্প্রদায়সহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত আসনের দাবি জানাচ্ছি।”

বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও হরিজন সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে রানী বলেন, “পৈতৃক সম্পত্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে তারা বৈষম্যের শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।” সামাজিক বঞ্চনার চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি লাশ দাফনে বাধার কথাও উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, আনোয়ারা ইসলাম রানী ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি এবং ‘রূপান্তর’-এর উদ্যোক্তা। তিনি ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৮১ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হন, আর ঈগল প্রতীক নিয়ে ২৩ হাজার ভোট পেয়ে রানী হন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী।

রংপুর সদর ও রংপুর সিটি করপোরেশনের ১০ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রংপুর-৩ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৬৯টি। এই আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৮ হাজার ২৪০ জন, যার মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ জন, নারী ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৯ জন এবং হিজড়া ভোটার ৫ জন। এরই মধ্যে ৫ হাজার ২৩০ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।