বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য স্বাগত র্যালি ও সমাবেশ করেছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টা থেকে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমবেত হতে থাকেন। পরে সেখান থেকে একটি স্বাগত র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে দোয়েল চত্বর, টিএসসি হয়ে শাহবাগের শহীদ ওসমান হাদি চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।
র্যালিতে অংশগ্রহণকারীরা ‘শুভ শুভ শুভ দিন, শিবিরের জন্মদিন’, ‘আজকের এই দিনে, হাদি তোমায় মনে পড়ে’, ‘আমরা সবাই হাদি হবো, হাদির মুখে কথা কবো’, ‘শহীদের রক্ত, বৃথা যেত দেবো না’, ‘বিচার বিচার বিচার চাই, হাদি হত্যার বিচার চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এ সময় তাদের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, সংগঠনের পতাকা, কালেমাখচিত সবুজ পতাকা এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তৈরি নানা ফেস্টুন দেখা যায়।
র্যালি শেষে শহীদ ওসমান হাদি চত্বরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, বর্তমান সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, এজিএস মহিউদ্দিন খানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, “প্রশাসনের বাহিনী ব্যবহার করে আমাদের রক্তাক্ত করা হয়েছে। সব বাহিনী আমাদের বিরুদ্ধ ব্যবহার করা সত্ত্বেও বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত প্রতি ইঞ্চি মাটিতে শিবিরের আবাদ হয়েছে। দীর্ঘ জুলুম, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে শিবিরের ইমান এবং আকিদা বেড়েছে।”
তিনি বলেন, “শহীদ ওসমান হাদির কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে চাই, তুমি জীবন দিয়েছো; তোমার রক্তের বদৌলতে লাখো ওসমান হাদি জন্ম নিয়েছে। যারা দেখিয়ে দেবে, বাংলাদেশের পতাকাকে কীভাবে শকুনের হাত থেকে রক্ষা করতে হয়।”
সাদ্দাম আরও বলেন, “এই বাংলাদেশে দীর্ঘ ৫৪ বছর বিভাজনের একটা রাজনীতি তৈরি করে রাখা হয়েছে। জাতির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক বিভাজিত রাজনীতি করে এ জাতির অগ্রগতি রোধ করে এ জাতিকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। আমরা বলতে চাই, ছাত্রশিবির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ধারণ করে। এ দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটির জন্য যদি কেউ জীবন দিতে প্রস্তুত থাকে সে হলো বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সুতরাং, কোনো ট্টাম্পকার্ড খেলে এ কাফেলাকে তোমরা আটকে রাখতে পারবা না।”
তিনি আরও বলেন, “গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে রায় দেওয়া মানে আজাদীর পক্ষে রায় দেওয়া, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন দুদক, স্বাধীনভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে এ দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন হওয়া। সুতরাং আমরা আগামী নির্বাচনে তাদের জন্য শ্রম দেবো, যারা ভারতে গিয়ে পালায়নি, যারা লন্ডনে গিয়ে পালায়নি।”
সমাবেশে শিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “১৯৭৭ সালে এই দিনে ইসলামি ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমরা ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পদাপর্ণ করেছি। এ পথ আমাদের জন্য কণ্টকাকীর্ণ ছিল। রক্তে ভেজা পথ ছিল। শাহাদাতের পিচ্ছিল পথ আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছে। আমাদের অসংখ্য ভাইকে জীবন দিতে হয়েছে।আমাদের শত শত ভাইকে গুম করা হয়েছিলো, আয়নাঘরে নির্যাতন করা হয়েছে, অনেক ভাইদের লাশগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন খালে-বিলে, নদীতে পাওয়া গিয়েছিল। ক্যাম্পাসগুলোতে আমাদের ভাইদের নির্যাতন করা হয়েছিল। আমাদের হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়েছিল। আমরা ন্যূনতম পরিচয়টুকু দিতে পারতাম না। এতকিছুর পরও যারা মেধা শ্রম যোগ্যতা দিয়ে এই সংগঠনকে মহীরূহে পরিণত করেছে তাদের মঙ্গল কামনা করছি।”
তিনি বলেন, “জুলাইয়ের পর ভেবেছিলাম সবাই পরিবর্তন হবে। সবার আচরণে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এ জায়গায় এসে আমরা হোঁচট খাচ্ছি। যাদের এতদিন আমরা দেখেছি মজলুম হিসেবে আমাদের পাশে থেকেছে। সেই মানুষগুলোর জালেম হওয়ার বহিঃপ্রকাশ তাদের চরিত্রে ফুটে উঠছে। তারা ক্যাম্পাসগুলোতে কোনো এজেন্ডা পায় না। শিবিরকে থামাতে হবে- এই একটাই এজেন্ডা তাদের।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাইয়ের পর আমদের অনেক ভাইকে হারাতে হচ্ছে। শহীদ ওসমান হাদি এই শাহবাগে দাঁড়িয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। হাদি হত্যার বিচার চেয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, যথাযথ ব্যবস্থা নেন। যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতায় আছেন, সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে শহীদদের খুনিদের বিচার আপনাদের করতে হবে।”
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “সামনে যারা ক্ষমতায় আসার চিন্তা করছেন; শহীদ ওসমান হাদি, রেজাউল করিমসহ সব শহীদদের খুনিদের বিচার আপনাদের করতে হবে। আমরা যদি কখনো ক্ষমতার কাছাকাছি যাই, সেদিন ওসমান হাদির খুনি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক; আমরা তার বিচার করবোই।”