শনিবার, 7 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

র‌্যাব বিলুপ্ত, পুরোনো কাঠামোয় এসআরবি নামে যাত্রা শুরু

আইন অনুযায়ী, র‌্যাবের জনবল, ক্ষমতা ও সম্পদের পাশাপাশি বাহিনীটির সঙ্গে সম্পর্কিত আদেশ ও কর্তৃত্বও এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে। বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ ও ব্যাংকে থাকা অর্থ, দায় এবং বিভিন্ন চুক্তিও নতুন ইউনিটের কাছে যাবে।

র‌্যাব বিলুপ্ত, পুরোনো কাঠামোয় এসআরবি নামে যাত্রা শুরু

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে গঠিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। র‌্যাবের বিদ্যমান জনবল, ক্ষমতা ও সম্পদের বড় অংশ নিয়েই আজ বুধবার থেকে নতুন নামে কাজ করছে ইউনিটগুলো। এমনকি র‌্যাবের লোগোর নকশাও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে; শুধু ইংরেজি ‘আরএবি’ অক্ষরের জায়গায় বসানো হয়েছে ‘এসআরবি’।

এত দিন র‌্যাবের অভিযান, গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য গণমাধ্যমকর্মীদের যেসব গ্রুপে পাঠানো হতো, সেগুলোর নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন নাম দেওয়া হয়েছে এসআরবি। বুধবার থেকে এসব গ্রুপে নতুন পরিচয়েই বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য পাঠানো শুরু হয়েছে।

র‌্যাবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজগুলোর নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। সেখানে এসআরবি নাম ব্যবহারের পাশাপাশি প্রোফাইল ছবিতে নতুন লোগো দেওয়া হয়েছে।

এর এক দিন আগে, মঙ্গলবার ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয়। নতুন আইনে র‌্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এত দিন র‌্যাবও কাগজে-কলমে পুলিশের অধীনেই ছিল।

র‌্যাবের জনবল ও সম্পদ যাচ্ছে এসআরবিতে

আইন অনুযায়ী, র‌্যাবের জনবল, ক্ষমতা ও সম্পদের পাশাপাশি বাহিনীটির সঙ্গে সম্পর্কিত আদেশ ও কর্তৃত্বও এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে। বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ ও ব্যাংকে থাকা অর্থ, দায় এবং বিভিন্ন চুক্তিও নতুন ইউনিটের কাছে যাবে।

একই সঙ্গে র‌্যাবের হিসাব বই, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র এসআরবির কাছে ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। র‌্যাবের সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা আদালতের কার্যক্রমও নতুন ইউনিট গঠনের কারণে বাতিল হবে না; সেগুলো বহাল থাকবে।

নতুন আইনে এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ইউনিটটির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রয়েছে।

নাগরিকদের অভিযোগ এবং সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ বা ক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। ওই কমিটির সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রাখার সুযোগ

র‌্যাবের কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের অন্যতম সমালোচনা ছিল নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ও মানবাধিকারকর্মীরা নতুন কোনো বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হলে সেটিতে শুধু প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্য রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

তবে নতুন আইনেও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের এসআরবিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপিও র‌্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছিল। দলটির পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, সংস্কারের পরিবর্তে বাহিনীটি বিলুপ্ত করা উচিত।

তবে নতুন আইন কার্যকরের পর র‌্যাবের বিদ্যমান জনবল, সম্পদ ও ক্ষমতার বড় অংশ নতুন ইউনিটে স্থানান্তরিত হওয়ায় বাহিনীটির মৌলিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সরকারের বক্তব্য, র‌্যাব বিলুপ্ত করে সম্পূর্ণ নতুন একটি ইউনিট হিসেবে এসআরবি গঠন করা হয়েছে।

‘শুধু সাইনবোর্ড বদল’—বিরোধীদের অভিযোগ

সংসদে বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা অভিযোগ করেছিলেন, র‌্যাবের জনবল, ক্ষমতা ও সম্পদ বহাল রেখে মূলত বাহিনীটির শুধু ‘সাইনবোর্ড’ পরিবর্তন করা হচ্ছে। তাঁরা বিলটি প্রত্যাহারেরও দাবি জানান।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, র‌্যাব বিলুপ্ত করার দাবি ছিল; একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের দাবি ছিল না। বিশেষায়িত এমন একটি বাহিনী কেন প্রয়োজন, তার যৌক্তিকতা আরও স্পষ্ট করার আহ্বানও জানান তিনি।

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী র‌্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, র‌্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পদ স্থানান্তরের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট না করে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এসব সম্পদ নতুন ইউনিটের কাছে থাকলে নতুন করে কেনাকাটার প্রয়োজন হবে না।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও নিষেধাজ্ঞা

র‌্যাবের বিরুদ্ধে গুমসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ, গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে।

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র‌্যাব এবং বাহিনীটির তৎকালীন ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

এসআরবি আইন সংসদে পাস হওয়ার পর মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান বলেন, নতুন নামে পুরোনো কাঠামো রেখে শুধু পোশাক বা নাম পরিবর্তন করলে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না। তাঁর মতে, প্রয়োজনে পুলিশের মধ্য থেকেই বিশেষায়িত দল গঠন করে আধুনিক অস্ত্র ও উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের জনসেবায় নিয়োজিত করা যেত।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আগের মতোই রাখার সুযোগ থাকলে বাহিনীর নাম বা পোশাক পরিবর্তন করলেও মৌলিক পরিবর্তন হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।