ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বা ‘লাল পাসপোর্ট’ আগেভাগে জমা দেওয়ার বিষয়টি জনমনে কৌতূহল এবং নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাধারণত পদত্যাগের পর পাসপোর্ট জমা দেওয়ার রীতি থাকলেও দায়িত্ব চলাকালীন এ ধরনের পদক্ষেপকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এই বিষয়টি নিয়ে বলেন, “মন্ত্রীদের কেউ কেউ পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন যাতে দেশের বাইরে যাওয়া সহজ হয়। কেউ কেউ সময়মতো ভিসা নিতে সুবিধার জন্য আগেভাগে এটি করেছে। তবে আমি বা আমার স্ত্রী এখনো কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিইনি। আমার পাসপোর্ট আমার কাছে আছে এবং সেটি যথারীতি বহাল আছে।”
অন্যদিকে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ স্বীকার করেছেন যে তিনি নিজের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি আর কোথাও যাবো না। সাধারণত জরুরি কোনো মিটিং ছাড়া বাইরে যাই না। অনেকেই দিয়েছে।” এছাড়া উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এই বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন যে, দায়িত্বের সময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেয়ার ঘটনা বিরল। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, “এ ধরনের পদক্ষেপ দায়িত্বকালীন সময়ে খুব অস্বাভাবিক। তবে কেউ যদি প্রক্রিয়াটি সহজ করতে আগেভাগে পাসপোর্ট জমা দিতে চান, সেটি তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।”
বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ উল্লেখ করেন, “দুই-তিনজন হলেও সমস্যা নেই। কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকলে মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার সুবিধা থাকলেও এর গুরুত্ব হ্রাস পায়। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া স্বাভাবিক।” তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের আগে এই ধরনের পদক্ষেপে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।”
বাংলাদেশে কূটনৈতিক পাসপোর্ট বা ‘লাল পাসপোর্ট’ প্রধানত রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা সদস্য, সংসদ সদস্য, সচিব, বিচারপতি ও বিদেশে কর্মরত কূটনীতিকদের জন্য ইস্যু করা হয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি, দ্রুত কাস্টমস চেক এবং ভিসা সুবিধা পাওয়া যায়। তবে পদ বা মেয়াদ শেষ হলে এটি জমা দেওয়াটা বাধ্যতামূলক।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, “কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকলে প্রায় যেকোনো দেশে দ্রুত যাওয়া সম্ভব, বেশিরভাগ দেশে ভিসার প্রয়োজন পড়ে না।” তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানান, সব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না, এবং দায়িত্বকালীন না থাকলে এই পাসপোর্টের সীমাবদ্ধতাও থাকে।
সাব্বির আহমেদ যোগ করেন, “কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়া মানেই সে ব্যক্তি সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা কূটনীতিক। বিদেশে যাওয়ার সময় সরকারের দেওয়া লেটার অব ইন্ট্রোডাকশন বা জিও হিসেবে কাজ করে। দায়িত্বকালীন অবস্থায় আর আলাদা জিও প্রয়োজন হয় না।”
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে সামনে রেখে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা ও কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।