তীব্র তাপদাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন পর্যাপ্ত না হওয়ায় লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষি, শিল্প ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে অন্তত ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
শিল্প ও কৃষি খাতে বিপর্যয়ের শঙ্কা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিল্পাঞ্চলগুলোতে। গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হওয়ায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন লক্ষ্যণীয় মাত্রায় কমে গেছে। অনেক উদ্যোক্তা বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহারের চেষ্টা করলেও বাজারে ডিজেলের তীব্র ঘাটতি ও চড়া মূল্যের কারণে সেটিও নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের ঝুঁকিতে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহে প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
কৃষি খাতেও চিত্রটি উদ্বেগজনক। একদিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে সেচ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ডিজেল সংকটে ফরিদপুর, জামালপুর ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার সেচপাম্প বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে করে মাঠের বোরো ধানসহ বিপুল পরিমাণ জমির ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ও গ্রামীণ চিত্র চলমান এসএসসি পরীক্ষার সময়ে এমন বিদ্যুৎ বিভ্রাট শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় সন্ধ্যার পর বারবার লোডশেডিং হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের মতে, দীর্ঘ সময় অন্ধকারে বসে থাকায় তাদের মানসিক চাপ বাড়ছে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের এই ঘাটতি কেবল শহরে সীমাবদ্ধ নেই; রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোর গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। অনেক এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিমাণ ৩০ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
পরিসংখ্যান ও জ্বালানি সংকট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করলেও উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। পিক আওয়ারে এই ঘাটতি ক্ষেত্রবিশেষে ১৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ১৬ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ১৪৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে, যার বড় একটি অংশই ছিল ঢাকার বাইরে।
বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহের অভাবে ১০টি গ্যাসভিত্তিক এবং ৮টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রসহ মোট ১৮টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এছাড়া আরও ৩৫টি কেন্দ্র আংশিক সক্ষমতায় চলছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি ও বকেয়া পরিশোধের চাপের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, ফার্নেস অয়েল ও গ্যাসের সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে। অন্যদিকে, ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভর কাঠামো ও মুনাফামুখী নীতির কারণে সাধারণ মানুষকে এই পরিস্থিতির খেসারত দিতে হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে চলমান গ্রীষ্মে জনভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।