কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ এক দশক পর এক সন্দেহভাজন আসামিকে আটকের ঘটনায় দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে তনুর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তৎকালীন বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ সাহা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ১০ বছর পর নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে মুখ খুলেছেন এই চিকিৎসক।
সামাজিক মাধ্যমে আবারও সমালোচনার মুখে
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ডা. কামদা প্রসাদ সাহা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের জবাব দেন। বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ থেকে বদলি হয়ে অন্য কর্মস্থলে থাকা এই চিকিৎসক জানান, গত কয়েক দিন ধরে তাঁকে নিয়ে চলা ‘সাইবার মবিং’ বা সামাজিক মাধ্যমে গণহারে আক্রমণ তাঁকে বিমূঢ় ও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এমনকি তাঁকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
ময়নাতদন্ত নিয়ে ডা. সাহার ব্যাখ্যা
ডা. কামদা প্রসাদ সাহা তাঁর পোস্টে তনু হত্যার ময়নাতদন্ত নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেন:
প্রথম ময়নাতদন্তে সংশ্লিষ্টতা নেই: তিনি জানান, ২০১৬ সালে প্রথম ময়নাতদন্ত ফরেনসিক বিভাগের অন্য একজন শিক্ষক করেছিলেন। রোস্টার অনুযায়ী ওই শিক্ষকের রিপোর্টের সঙ্গে ডা. সাহার কোনো সম্পর্ক ছিল না।
দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের সীমাবদ্ধতা: আদালতের নির্দেশে লাশ কবর থেকে তুলে ১০-১৫ দিন পর যখন দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করা হয়, তখন শরীরটি পচে (ডিকম্পোজড) গিয়েছিল। ডা. সাহা ওই তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ বোর্ডের প্রধান ছিলেন। পচে যাওয়ার কারণে সুনির্দিষ্টভাবে মৃত্যুর কারণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যা ফরেনসিক বিজ্ঞানে একটি স্বাভাবিক ঘটনা।
তিন পুরুষের ডিএনএ: সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় তনুর পোশাকে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল, যা দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
চরিত্রহননের অভিযোগ অস্বীকার
ফেসবুক পোস্টে ডা. সাহা অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষ আবেগের বশবর্তী হয়ে রিপোর্টের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তাঁর দাবি, "ওই রিপোর্টে কোনোভাবেই উল্লেখ করা হয়নি যে তনু ইচ্ছাকৃতভাবে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সংসর্গ করেছিল। সম্ভবত সবাই তিনজনের ডিএনএ পাওয়ার ব্যাপারটিকেই এখানে কোরিলেট করেছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট কখনোই বিচারপ্রক্রিয়ায় অন্তরায় নয়, বরং তদন্তকারী সংস্থা প্রকৃত আসামিকে শনাক্ত করতে পারলে এই রিপোর্ট সহায়ক হিসেবেই কাজ করবে।
দেশ ত্যাগের গুজব ও নিরাপত্তা শঙ্কা
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ‘দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা’ সংক্রান্ত গুজবটি উড়িয়ে দিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "আমি কি কোনো অপরাধ করেছি? আমি শুধু চিকিৎসক হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালন করেছি। আমি দেশ ছেড়ে পালাতে যাব কেন?"
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, কোনো একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ব্যক্তিগত স্বার্থে তাঁকে অপদস্থ করছে। জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এই চিকিৎসক তনু হত্যার প্রকৃত বিচার দাবি করে বলেন, তিনি অতীতেও শত শত মামলায় আদালতকে সহায়তা করেছেন এবং এই মামলাতেও তা অব্যাহত রাখবেন।
সবশেষে ডা. কামদা প্রসাদ সাহা জনগণের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন—হাজার হাজার মানুষের সামনে তাঁর যে সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি করা হলো, তার দায়ভার কে নেবে?