রবিবার, 20 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

ইউপি নির্বাচনে জামানত বাড়ছে পাঁচ গুণ, ব্যয়সীমা দ্বিগুণ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে নতুন করে কঠোর বিধি আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে জামানত পাঁচ গুণ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয়সীমা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী অপরাধের শাস্তি বাড়ানো এবং ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ মিললে নির্বাচন বন্ধ করার ক্ষমতাও ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ইউপি নির্বাচনে জামানত বাড়ছে পাঁচ গুণ, ব্যয়সীমা দ্বিগুণ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে নতুন করে কঠোর বিধি আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে জামানত পাঁচ গুণ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয়সীমা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী অপরাধের শাস্তি বাড়ানো এবং ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ মিললে নির্বাচন বন্ধ করার ক্ষমতাও ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে প্রার্থীদের জন্য কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হচ্ছে না। অর্থাৎ আগের নিয়মের মতোই যোগ্যতা পূরণ করলে যে কেউ ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন।

এসব বিধান যুক্ত করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনী চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালায় সংশোধন এনে তৈরি করা নতুন বিধিমালাটি ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ করে ইসিতে ফিরেছে। আগামী সপ্তাহে এসআরও নম্বর দেওয়ার জন্য এটি পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।

এদিকে স্থানীয় সরকারের বাকি চার প্রতিষ্ঠান উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের পৃথক নির্বাচনী বিধিমালাও সংশোধন করা হচ্ছে। এসব বিধিমালা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

জামানত বাড়ছে পাঁচ গুণ

সংশোধিত ইউপি নির্বাচন বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সাধারণ আসনের সদস্য বা মেম্বার এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীদের জামানতও ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে।

এবার কোনো প্রার্থী মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ না পেলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। বর্তমানে প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত বা বাতিলের বিধান রয়েছে।

একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়সীমাতেও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয় ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে।

প্রার্থী কমানোর লক্ষ্য ইসির

ইসি সূত্র অনুযায়ী, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলীয় পরিচয় ও প্রতীক ছাড়াই অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে কমিশন। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও প্রার্থী বাড়তে পারে। এতে ব্যালটে একাধিক প্রার্থী ও প্রতীক ব্যবস্থাপনার চাপ বাড়বে।

শুধু ব্যালটেই নয়, প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লে তাঁদের এজেন্ট, কর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতিও বাড়বে। এর ফলে নির্বাচন পরিচালনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভোট গ্রহণের সামগ্রিক ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থীর সংখ্যা সীমিত করার পরিকল্পনা করছে ইসি। এ লক্ষ্যেই নির্বাচনী বিধিমালায় একাধিক বিধিনিষেধ যুক্ত করা হচ্ছে।

তবে জামানত পাঁচ গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্তে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যাও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আর্থিকভাবে তুলনামূলক দুর্বল হলেও যোগ্য এমন ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, এর ফলে নাগরিক অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল আলীম বলেন, জামানত বাড়ানো এবং তা ফেরত পাওয়ার শর্ত কঠোর করার ফলে প্রার্থী কমবে, নির্বাচন পরিচালনার খরচ কমবে এবং ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে—এটি ঠিক। তবে বেশি জামানতের কারণে অনেক যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নেওয়া কঠিন হতে পারে। আবার জামানত হারানোর আশঙ্কায় অনেকেই প্রার্থী হতে আগ্রহী হবেন না। এতে যেকোনো যোগ্য ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এই ব্যবস্থার কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বর্তমানে অনেক প্রার্থী জয় নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবে ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করান। পরে এসব প্রার্থীর নামে অতিরিক্ত এজেন্ট নিয়োগ করে তাঁদের মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়। জামানতের পরিমাণ বাড়লে ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করানো এবং এজেন্ট কেনাবেচার প্রবণতা কমতে পারে।

বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবের সঙ্গে একমত আবদুল আলীম। তবে নির্ধারিত সীমার মধ্যেই প্রার্থীরা যেন নির্বাচনী ব্যয় করেন, তা নিশ্চিত করতে ইসিকে কঠোর নজরদারি করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

জামানত নিয়ে ইসির ব্যাখ্যা

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ অবশ্য জামানত বাড়ানোর কারণে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে জীবনযাত্রার ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে, ২৫ হাজার টাকা জামানত একজন প্রার্থীর জন্য খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত আগে থেকেই এই পরিমাণ নির্ধারিত আছে। সেটির সঙ্গে সমন্বয় করতে আমরা ইউপি নির্বাচনে জামানত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছি। সেই সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে।’

তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনী আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ করে ইসিতে এসেছে। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী বিধিমালাও দ্রুত ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে।

হলফনামায় নতুন তথ্য, বাড়ছে শাস্তির বিধান

সংশোধিত ইউপি নির্বাচন বিধিমালায় প্রার্থীদের নির্বাচনী হলফনামায় আরও কিছু তথ্য সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি হলফনামায় নতুন তথ্য দেওয়া এবং সেখানে অসত্য তথ্য প্রদান করলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।

কোনো নির্বাচনে মাত্র একজন প্রার্থী থাকলে আগের মতোই তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণার বিধান বহাল থাকছে।

নির্বাচন-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়া, ভয় দেখানো বা আঘাত করা কিংবা কোনো ভোটারকে ভোটদানে বাধা দেওয়ার ঘটনায় সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তা অথবা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনী অপরাধের শাস্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অপরাধে ন্যূনতম ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।

ভোটে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতাও ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো প্রার্থীর এজেন্ট না থাকলেও সংশ্লিষ্ট নির্বাচন বৈধ হিসেবে গণ্য হবে—এমন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পরিবর্তন আনা হচ্ছে নির্বাচনী প্রতীকেও।