শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

ক্রমেই নামছে পানির স্তর: বাড়ছে রাজধানীর ঝুঁকি

২০৩০ সালে ঢাকায় প্রতিদিন ৪৩ লাখ ঘনমিটার এবং ২০৩৫ সালে ৫২ লাখ ঘনমিটার পানির চাহিদার পূর্বাভাস রয়েছে।

ক্রমেই নামছে পানির স্তর: বাড়ছে রাজধানীর ঝুঁকি
অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, মাটির ভেতর বৃষ্টির জল প্রবেশের পথ রুদ্ধ হওয়া এবং লাগামহীন কংক্রিটকরণের প্রভাবে ঢাকার মাটির নিচের পানির সঞ্চয় দ্রুত তলানিতে নামছে।

কয়েক দশকে ভূগর্ভস্থ স্তরের এই পতন তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে নগরীর পানির স্তর ভূমি থেকে আনুমানিক ২৫ মিটার গভীরে ছিল। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে তা ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ৬০ মিটার, ২০২৩ সালে ৭৫ মিটার এবং ২০২৪ সালে নেমে দাঁড়ায় ৮৯ দশমিক ৮৮ মিটারে। চলতি বছরের সমাপ্তি নাগাদ কিছু এলাকায় এই গভীরতা ৯০ থেকে ৯২ মিটারে গিয়ে ঠেকতে পারে। বিশেষ করে মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, তুরাগ ও সেনানিবাসের কিছু অংশে পানির স্তর ইতোমধ্যে প্রায় ৯২ মিটার নিচে নেমে গেছে। গবেষকদের মতে, এই ধারা অপরিবর্তিত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পানির স্তর ১২০ মিটার গভীরতায় চলে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে, যার ফলে ভবিষ্যতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রক্রিয়া জটিল হবে এবং পানি তোলার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

দুই কোটির বেশি মানুষের নগরীতে ভূগর্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ

রাজধানীর প্রায় দুই কোটি ৩২ লাখ বাসিন্দার দৈনন্দিন পানির জোগান নিশ্চিত করতে ঢাকা ওয়াসা প্রতি ২৪ ঘণ্টায় আনুমানিক ২৮০ থেকে ২৯০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে থাকে। এই মোট জোগানের ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশই আসে মাটির নিচ থেকে, আর বাকি ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ সংগৃহীত হয় ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে। অর্থাৎ নগরীর পানি ব্যবস্থাপনা এখনও বহুলাংশে ভূগর্ভের উৎসের ওপরই নির্ভরশীল। অথচ দুই দশক আগে ঢাকা ওয়াসা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর এই নির্ভরশীলতা ৭০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছিল। সেই লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা ফলপ্রসূ হয়নি; বরং নগরীর বাড়তে থাকা চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর বাড়তি গভীর নলকূপ বসাতে হচ্ছে সংস্থাকে।

নীতিমালা শিথিল করে বসছে হাজারো গভীর নলকূপ

পূর্বে ওয়াসার নিয়মে একটি পাম্পের এক হাজার মিটারের মধ্যে নতুন গভীর নলকূপের অনুমতি দেওয়ার বিধান ছিল না। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় পানির মৌলিক চাহিদা মেটানোর যুক্তি দেখিয়ে সেই দূরত্ব কমিয়ে ৫০০ মিটারে নামিয়ে আনা হয়। বর্তমানে সেই সীমানাও কার্যকর থাকছে না, ফলে ওয়াসা নিজেই একই জোনের ভেতর একাধিক গভীর নলকূপ বসাতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা এলাকায় ১২০০ থেকে ১৩০০ গভীর নলকূপ চালু রয়েছে। বিশেষ করে নতুন আবাসিক এলাকাগুলোতে ওয়াসার পাইপলাইন এখনও পৌঁছায়নি, ফলে সেখানকার বাসিন্দারা নিজেদের প্রয়োজনে ব্যক্তিগত গভীর নলকূপের মাধ্যমেই পানি তুলছেন। নগর গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, বিশ্বের বিভিন্ন শহর এখন কংক্রিট সরিয়ে সবুজ এলাকা বাড়াচ্ছে, ঢাকার জন্যও এর বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই।

কংক্রিটের বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূকম্পন ঝুঁকি

মাত্রাতিরিক্ত পানি উত্তোলনের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত হ্রাস পাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা থেকে উন্মুক্ত সবুজ এলাকা হারিয়ে যাচ্ছে। পুরো শহর কংক্রিটে রূপ নেওয়ায় বৃষ্টির জল মাটিতে স্বাভাবিকভাবে রিচার্জ হওয়ার আগেই শুকিয়ে যায় বা নিষ্কাশিত হয়ে যায়। এর প্রভাবে শহরের উষ্ণতা যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রতিবছর গড়ে প্রায় তিন মিটার করে নামছে পানির স্তর। পরিবেশবিদরা সতর্ক করছেন, পানির স্তর ১২০ মিটারে নামলে পানির হাহাকারের পাশাপাশি উত্তোলন ব্যয় যেমন কয়েকগুণ বাড়বে, তেমনি ভূকম্পনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি হবে। ইতোমধ্যেই মিরপুর, সেনানিবাস ও নিকটবর্তী এলাকায় পানির স্তর ৯২ মিটারের নিচে নেমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির জোগান স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে ওয়াসা নিজেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

জলাধার দূষণ ও শোধনাগার কেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ সমাধান

ওয়াসা কর্তৃপক্ষের মতে, ঢাকার আশপাশের ভূ-উপরিস্থ পানির সিংহভাগ উৎস মারাত্মকভাবে নষ্ট ও দূষিত হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়েই মাটির নিচ থেকে পানি তুলতে হচ্ছে। তবে ২০২৫ সালের এক জরিপে ইতিবাচক একটি দিকও লক্ষ্য করা যায়। যেসব এলাকায় ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে, বিশেষ করে পদ্মা জশলদিয়া শোধনাগারের পানি যুক্ত হওয়ার পর পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বহু গভীর নলকূপ। এর ফলে সেখানে পানির স্তর কিছুটা উপরের দিকে উঠেছে এবং পানির পর্যাপ্ত চাপের কারণে সেখানে অনেক স্থানে ট্যাপের মাধ্যমে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। গবেষকদের অভিমত, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার যত বৃদ্ধি পাবে, পানির স্তর তত উন্নতির দিকে যাবে। এজন্য সায়েদাবাদ ফেজ-৩ সহ অন্যান্য পানি শোধনাগার দ্রুত চালু করা এবং রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর পানি ব্যবহারের উপযোগী করার জন্য বড় ধরনের মহাপরিকল্পনা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ ২০৩০ সালে ঢাকায় প্রতিদিন ৪৩ লাখ ঘনমিটার এবং ২০৩৫ সালে ৫২ লাখ ঘনমিটার পানির চাহিদার পূর্বাভাস রয়েছে।

সবুজায়ন হ্রাস ও এলাকাভিত্তিক পানির স্তরের চিত্র

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর ২০২০ সালের এক গবেষণায় উঠে আসে, ঢাকার মূল নগর এলাকার প্রায় ৮২ শতাংশ ভূমি এখন কংক্রিটে ঢাকা, যা ১৯৯৯ সালে ছিল ৬৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং ২০০৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭৭ দশমিক ১৮ শতাংশে। বিপরীতে জলাভূমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশে, যা দুই দশক পূর্বেও ছিল ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান উল্লেখ করেন, উন্নত বিশ্বের মতো ঢাকা থেকেও অপ্রয়োজনীয় কংক্রিট তুলে দিয়ে সবুজ চত্বর বাড়ানো এখন সময়ের দাবি, যা ভূগর্ভে পানির প্রবেশ বাড়াবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো না গেলে শহরটিকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ঢাকা ওয়াসার দশটি জোনে পানির স্তরের গভীরতা পর্যালোচনা করলে বৈষম্যমূলক চিত্র দেখা যায়:
জোন-১ (গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া): পানির স্তর ৮৩ দশমিক ২৫ মিটার নিচে।
জোন-২ (লালবাগ, বংশাল, ধানমন্ডি এলাকা): পানির স্তর ৬৮ দশমিক ৮৯ মিটার নিচে।
জোন-৩ (ধানমন্ডি, রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুর): পানির স্তর ৬৮ দশমিক ৩৬ মিটার নিচে।
জোন-৪ (রোকেয়া সরণির পশ্চিম অংশ): পানির স্তর ৮৯ দশমিক ৮৮ মিটার নিচে।
জোন-১০ (মিরপুর-১০, পল্লবী, কাফরুল, তুরাগ, সেনানিবাসের অংশ): পানির স্তর সর্বোচ্চ ৯২ মিটার নিচে।
জোন-৯ (বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, দক্ষিণখান, উত্তরখান, উত্তরা): পানির স্তর ৭৩ দশমিক ৭৮ মিটার নিচে।
জোন-৫ (গুলশান, বারিধারা, আফতাবনগর): পানির স্তর ৮৪ দশমিক ২৫ মিটার নিচে।
জোন-৬ (খিলগাঁও, রমনা, পল্টন, মতিঝিল): পানির স্তর ৭৮ দশমিক ৭০ মিটার নিচে।
জোন-৭ (গুলশান, বনানী, তেজগাঁও): পানির স্তর ৮৪ দশমিক ২৫ মিটার নিচে।
জোন-৭ এর অপর অংশ (যাত্রাবাড়ী, কদমতলী অঞ্চল): পানির স্তর ৮৫ দশমিক ৫০ মিটার নিচে।

সংকটের মূল কারণ ও ভবিষ্যৎ করণীয়

পানির স্তর নেমে যাওয়ার পেছনে মূলত মানুষের তৈরি কারণগুলোই দায়ী। অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, সবুজায়ন ধ্বংস করে কংক্রিট বিছানো এবং ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক শিল্পকারখানার উপস্থিতি এই পরিস্থিতিকে জটিল করেছে; এর সাথে যুক্ত হয়েছে কম বৃষ্টিপাতের প্রাকৃতিক কারণ। ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ সতর্ক করে বলেন, পানির স্তর যত নিচে নামবে, মাটির স্বাভাবিক পানি ধারণ ও রিচার্জ ক্ষমতা তত হ্রাস পাবে, যা একসময় রাজধানীকে পানির মারাত্মক সংকটে ফেলবে।

বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা পাঁচটি প্রধান উৎস থেকে পানি সরবরাহ করছে। এর মধ্যে পদ্মা জশলদিয়া শোধনাগার থেকে ৪৫ কোটি লিটার, সায়েদাবাদ ফেজ-১ ও ২ থেকে ২৩ কোটি লিটার এবং চাঁদনীঘাট শোধনাগার থেকে ২ কোটি লিটার পানি আসে। এছাড়া সাভারের ভাকুর্তা শোধনাগার থেকে ১৪ কোটি লিটার পানি ভূগর্ভ থেকে তুলে শোধন করে সরবরাহ করা হচ্ছে।

এই বিপর্যয় রোধে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, সরকারি ও ব্যক্তিগত উভয় পর্যায়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে হবে। মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের প্রবণতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, বৃষ্টির পানি ধরে রেখে পুনর্ব্যবহার বাড়ানো, ঢাকা ও তার চারপাশে নতুন কারখানার অনুমোদন বন্ধ করা, কংক্রিটের অপ্রয়োজনীয় বিস্তার রোধ এবং পানির যেকোনো ধরনের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করা প্রয়োজন।