জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মহাসচিব হিসেবে দেওয়া শেষ ভাষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদার এবং বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন আন্তোনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে এআইয়ের নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক কাঠামো গড়ে তোলা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামোতে সংস্কারের ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী ভাষণে এসব কথা বলেন মহাসচিব গুতেরেস। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে সাধারণ পরিষদে এটাই তার শেষ ভাষণ। তার দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে।
বিদায়ী ভাষণে গুতেরেস বলেন, এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে এর নিরাপত্তাঝুঁকিও বাড়ছে। তাই এআই প্রযুক্তির বিকাশে নেতৃত্ব দেওয়া দেশগুলোকে উদ্ভূত নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য ভাগাভাগি করতে হবে। ঝুঁকি যাচাই, পরীক্ষা ও মূল্যায়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি এমন অভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা সবাইকে সুরক্ষা দিতে পারে।
বিশ্বনেতাদের প্রতি এআইয়ের উন্নয়ন ও বিস্তারের গতি ‘দায়িত্বশীলভাবে নিয়ন্ত্রণে’র উপায় বের করার আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। একই সঙ্গে ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ এবং ‘বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন নজরদারি’র অধীনে একটি বহুপাক্ষিক এআই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
গত কয়েক দিনে দ্রুত বিকাশমান এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তি খাত থেকেই একের পর এক সতর্কবার্তা এসেছে। এর মধ্যেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বিষয়টি সামনে আনলেন গুতেরেস।
এআইয়ের বিকাশ মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে—এমন উদ্বেগের মধ্যে এ সপ্তাহে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও এআই ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে চীনের ডিপসিক, যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
ভাষণে গুতেরেস বলেন, “এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়া দেশগুলোর উচিত উদ্ভূত নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য ভাগাভাগি করা, পরীক্ষা ও মূল্যায়নে সহযোগিতা করা। তাদের উচিত এমন অভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া, যা আমাদের সবাইকে সুরক্ষা দেবে।”
রয়টার্সের লিখেছে, এআই নিয়ন্ত্রণ ও এর বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার পক্ষে গুতেরেস দীর্ঘদিন ধরেই কথা বলে আসছেন। ২০২৩ সালে জাতিসংঘ ৩৯ সদস্যের একটি এআইবিষয়ক উপদেষ্টা সংস্থা গঠন করে। এতে প্রযুক্তি কোম্পানির নির্বাহী, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদদের যুক্ত করা হয়। একই বছর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে বৈঠক করে।
চলতি বছরও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, এআইয়ের বিকাশ মানুষের বোঝাপড়া ও বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষায়, যারা এআই তৈরি করছেন, তাদের অনেকেই যখন ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন, তখন সেই উদ্বেগ উপেক্ষা করা যায় না। জাতীয় পর্যায়ের পদক্ষেপের পাশাপাশি বৈশ্বিক সমন্বয় জরুরি, কারণ এআইয়ের ঝুঁকি কোনো দেশের সীমান্তে আটকে থাকে না।
এদিকে এআই নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেও আলোচনা চলছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আলোচনার জন্য এআই-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঘটনার বিষয়ে একটি নতুন তথ্য জানানোর ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছে। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এআই-ঘটনাগুলো এর আওতায় আসতে পারে।
যুদ্ধ বন্ধ ও জাতিসংঘ সংস্কারের আহ্বান
সাধারণ পরিষদে নিজের দেওয়া শেষ ভাষণে গুতেরেস শুধু এআই নয়, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও জাতিসংঘের সংস্কারের ওপরও জোর দেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি উত্তেজনা কমানো ও সংলাপের আহ্বান জানান।
গুতেরেস বলেন, “লড়াই অবশ্যই বন্ধ করতে হবে, মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৌ চলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতা পুরোপুরি পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের ক্ষেত্রে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে আবারও অবস্থান জানান গুতেরেস। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দূষণকারীদের দায়ী করে তিনি বলেন, “দূষণকারীদের মূল্য দিতে হবে।”
জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গুতেরেস। তার মতে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থাগুলো ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এমন এক সময়ের ক্ষমতার বাস্তবতা ও স্বার্থকে প্রতিফলিত করছে, যা অনেকটাই অতীতের বিষয়।
জাতিসংঘের নেতৃত্বে ১০ বছর কাটানোর পর বিদায়ী ভাষণে গুতেরেস বলেন, মহাসচিবের পদে না থাকলেও শান্তি সম্ভব—এই বিশ্বাস তার অটুট থাকবে। তিনি জাতিসংঘ সনদের মূল্যবোধের পক্ষে কাজ করে যাওয়ারও অঙ্গীকার করেন।