২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর সম্মিলিত বিমান হামলা শুরু করে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সংশ্লিষ্ট সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা শুরু করে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
দীর্ঘ চল্লিশ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ব্যয়বহুল এই যুদ্ধে বিশেষ কোনো অর্জন না থাকায় দেশের ভিতরের এবং বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এরপর প্রশাসনের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার ব্যতিক্রমধর্মী বক্তব্যের ফলে শুরু হয় গুঞ্জন। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দ্বিচারিতার উদাহরণ টেনে অনেকেই মন্তব্য করছেন যুদ্ধবিরতির নামে ইরানে আরও জোরদার অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দ্বিচারিতা:
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনার কথা বলে আরও জোরদার অভিযান চালানোর নজির বারবার দেখা গেছে। এটি তাদের কৌশলগত দ্বিচারিতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭২ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্যারিস শান্তি আলোচনা চলাকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ‘ক্রিসমাস বোম্বিং’ (অপারেশন লাইনব্যাকার II) চালিয়ে উত্তর ভিয়েতনামের ওপর সবচেয়ে তীব্র বোমাবর্ষণ করেন। আলোচনায় ‘বিরতি’র কথা বলা হলেও এই অভিযানে হাজার হাজার বোমা ফেলা হয়, যাতে শত্রুপক্ষকে চাপে ফেলে শান্তি চুক্তিতে সুবিধা আদায় করা যায়। পরে ১৯৭৩ সালের প্যারিস চুক্তিতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থন দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
আরেকটি উদাহরণ ২০১১ সালের লিবিয়া অভিযান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী ‘সিভিলিয়ানদের সুরক্ষা’ ও যুদ্ধবিরতির কথা বলে নো-ফ্লাই জোন আরোপ করে। কিন্তু বাস্তবে তারা মুয়াম্মার গাদ্দাফির বাহিনীর ওপর ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে সরকার উৎখাত করে। প্রাথমিক ‘মানবিক’ লক্ষ্য ছাড়িয়ে অভিযানটি রেজিম চেঞ্জে পরিণত হয়, যা অনেক বিশ্লেষকই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
যেকারণে জোরালো হচ্ছে সন্দেহ
এই ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে বর্তমান ইরান পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের পাশে দাঁড়িয়ে জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের বিমান বাহিনীর জেনারেল ড্যান কেইন (ড্যান কেইন) স্পষ্টভাবে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে তার সামরিক উদ্দেশ্য পূরণ করেছে এবং প্রয়োজনে পুনরায় যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত। তিনি যুদ্ধবিরতিকে “একটি বিরতি” বলে অভিহিত করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন, “আদেশ বা আহ্বান পেলে যৌথ বাহিনী গত ৩৮ দিনে আমরা যে গতি ও নির্ভুলতা প্রদর্শন করেছি, ঠিক সেই একই গতি ও নির্ভুলতার সাথে যুদ্ধ অভিযান পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে।” কেইন আরও জানান, অভিযানে যৌথ বাহিনী ১৩,০০০-এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, ইরানের ৮০ শতাংশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রচলিত নৌবহর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একই সুরে ইরানকে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
পরবর্তীতে আরও একটি পোস্টে তিনি বলেন, “ইরানকে সামরিক অস্ত্র সরবরাহকারী যেকোনো দেশের ওপর কোনো ছাড় ছাড়াই অবিলম্বে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।” SIPRI (স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট)-এর সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইরানের আমদানি করা সমস্ত অস্ত্র রাশিয়া থেকে এসেছে। ফলে ট্রাম্পের এই শুল্ক মূলত রাশিয়াকে লক্ষ্য করে, যা যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর অংশ বলে মনে হয়।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই যুদ্ধবিরতি কোনো স্থায়ী শান্তির পথ নয়, বরং একটি কৌশলগত ‘পজ’। হেগসেথ ও কেইনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, মার্কিন বাহিনী ‘অপারেশন ইপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত এই ৩৮ দিনের অভিযানকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে দেখছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বলছে—আদেশ পেলেই আবার একই গতিতে হামলা চালানো হবে। এটি ইঙ্গিত করে যে, যুদ্ধবিরতির আড়ালে তারা পরবর্তী বৃহত্তর অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক-কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখছে। ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ও নৌবহরের ব্যাপক ধ্বংস ইতোমধ্যে তেহরানকে দুর্বল করেছে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি আরও এক ধাপ এগিয়ে ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ‘মিশন ক্রিপ’ (অভিযানের লক্ষ্য বাড়ানো) কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভিয়েতনাম ও লিবিয়ার মতো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রাথমিক ‘সীমিত’ লক্ষ্যের কথা বলে শুরু করা অভিযান পরে রাজনৈতিক-সামরিক লক্ষ্য অর্জনে পরিণত হয়। বর্তমানে ইরানের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি রয়েছে। যদি ইরান যুদ্ধবিরতি মেনে চলে, তবুও মার্কিন প্রস্তুতি দেখিয়ে চাপ বজায় রাখা হচ্ছে। ফলে এই ‘বিরতি’ সাময়িক শান্তি নয়, বরং পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি বলে মনে হয়।
সূত্র: পেন্টাগন ব্রিফিং (পিট হেগসেথ ও জেনারেল ড্যান কেইনের বক্তব্য, ৮ এপ্রিল ২০২৬), প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্ট, SIPRI অস্ত্র আমদানি তথ্য (২০২১-২০২৫), এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।