ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলো সমর্থন না দেওয়ায় দুই পক্ষের দূরত্ব ইতিহাসের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতির ফলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর সংকটে পড়েছে এবং প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কি এই জোট আদৌ টিকে থাকতে পারবে।
ন্যাটো দেশগুলোর প্রতিরক্ষা বাজেটে অনীহা থেকে শুরু করে ডেনমার্কের দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাবের মতো ট্রাম্পের ন্যাটোবিরোধী মনোভাবের নজির আগে থেকেই ছিল। তবে ইরান যুদ্ধে অসহযোগিতাকে ট্রাম্প এই জোটের গায়ে এক 'স্থায়ী কলঙ্ক' হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর বিপরীতে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বিষয়টিকে একটি 'ট্রান্স-আটলান্টিক স্নায়ুচাপের পরীক্ষা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান কি সম্ভব?
আইনগতভাবে ট্রাম্প চাইলেই হঠাৎ করে ন্যাটো থেকে বের হয়ে যেতে পারবেন না। এর জন্য মার্কিন সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অথবা কংগ্রেসের বিশেষ আইনের প্রয়োজন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প জোট না ছেড়েই ন্যাটোকে অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তিনি যদি ঘোষণা করেন যে, আক্রান্ত মিত্রদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসবে না (আর্টিকেল ৫-এর লঙ্ঘন), তবে জোটের কার্যকারিতা কার্যত শেষ হয়ে যাবে।
ইউরোপের সামরিক প্রস্তুতি ও সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে ইউরোপে প্রায় ৮৪ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে অসহযোগিতা করা দেশগুলো থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে বন্ধুপ্রতিম দেশে নেওয়ার কথা ভাবছেন ট্রাম্প। যদিও রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ বাড়িয়েছে, তবুও প্রযুক্তিগতভাবে তারা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শূন্যস্থান পূরণ করতে ইউরোপের অন্তত ১০ বছর সময় এবং ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলার প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইউরোপের বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা সহজেই ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নিরাপত্তা ও স্বার্থের সমীকরণ
সাবেক ইতালীয় রাষ্ট্রদূত স্টেফানো স্টেফানি আল জাজিরাকে জানান, ন্যাটো কেবল ইউরোপ নয়, বরং মার্কিন স্বার্থ রক্ষারও একটি বড় হাতিয়ার। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর ন্যাটো দেশগুলোই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং আফগানিস্তানে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেছে। এমনকি বর্তমান ইরান যুদ্ধেও ইউরোপের ঘাঁটিগুলো মার্কিন সামরিক রসদ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জার্মান সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল কার্স্টেন ব্রুয়েরের মতে, ২০২৯ সালের মধ্যে রাশিয়া পুনরায় ন্যাটো অঞ্চলে হামলা চালানোর মতো শক্তি ফিরে পেতে পারে। ফলে ২০২৭ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে ন্যাটোকে সামরিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্য নিতে হচ্ছে। ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে গুটিয়ে নেন, তবে ন্যাটো হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু তার রূপ হবে অনেক বেশি আঞ্চলিক এবং ভিন্নধর্মী। সব মিলিয়ে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এখন একটি বড় অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।