শনিবার, 7 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি চুক্তিতে কী আছে?

জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কয়েক মাস আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিতে আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন বা ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্তের পর এই নতুন সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি চুক্তিতে কী আছে?

জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কয়েক মাস আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিতে আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন বা ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্তের পর এই নতুন সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই সমঝোতার উদ্দেশ্য হলো জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন।


বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এই সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে এলপিজি ও এলএনজির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প উৎস হতে পারে।


তিনি আরও বলেন, “দেশের স্বার্থে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আরও অনেক দেশের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা আছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও হলো। এটি দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”


বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে এবং আমদানির নতুন উৎস তৈরি হবে, যা সংকটের সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে।


বর্তমানে বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর, বিশেষ করে কাতার ও সৌদি আরবের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে।


জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ম তামিম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য আনা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।


তিনি বলেন, “এখন আমাদের প্রয়োজন হলে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে পারবো। তবে চুক্তি বা সমঝোতার নামে যদি আমাদের বাধ্য করা হয়, সেটি দেশের জন্য ভালো হবে না। সমঝোতার বিস্তারিত প্রকাশ না হলে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যাবে না।”


সমঝোতায় কী রয়েছে


ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট স্বাক্ষর করেন।


বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে এই সমঝোতা ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি সাশ্রয়ী মূল্য ও টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।


এতে আরও জানানো হয়, তেল, গ্যাস, ভূতাপীয় ও জৈবশক্তি খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময় এবং গবেষণা সহযোগিতা সহজ হবে।


এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি, এলপিজি এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, একক উৎসের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিকল্প উৎস থাকা জরুরি।


অধ্যাপক ম তামিম আবারও বলেন, সমঝোতার বিস্তারিত প্রকাশ না হলে কোন খাতে কী ধরনের অঙ্গীকার রয়েছে তা পুরোপুরি বোঝা যাবে না। তবে তার মতে, উৎস বাড়ানো সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক।


চুক্তির পরও নতুন সমঝোতা কেন


চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তিতে আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন বা ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি কেনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা নিয়ে তখনও সমালোচনা হয়।


বাংলাদেশের গ্যাস খাতে ইতোমধ্যে মার্কিন কোম্পানিগুলোর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। পাশাপাশি গভীর সমুদ্রের সব ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে মার্কিন কয়েকটি কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে।


তবে গভীর সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে। দেশের সমুদ্রসীমা ১৫টি গভীর সমুদ্র এবং ১১টি অগভীর ব্লকে বিভক্ত।


বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের এপ্রিলে দেশের মোট এলপিজি আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে।


এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির একটি চুক্তি করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় ওই চুক্তিতে মার্কিন চাপ ছিল বলেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।


জ্বালানি সাময়িকী এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বড় ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।


তিনি জানান, দেশের গ্যাস উৎপাদনের বড় অংশ মার্কিন কোম্পানি শেভরন পরিচালনা করে। পাশাপাশি একটি মার্কিন কোম্পানি এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনা করছে এবং আরও একটি কোম্পানি গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের প্রস্তাব দিয়েছে। এলপিজি সরবরাহেও তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।


বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।


জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি নির্ভর, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।


সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। একইভাবে এলএনজির ক্ষেত্রেও কাতার ও ওমানের ওপর নির্ভরতা রয়েছে।


তবে সাম্প্রতিক সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী কাতার সময়মতো এলএনজি সরবরাহ করতে না পারায় সংকট আরও বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশকে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।


হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার প্রভাবও দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছে।