সামান্য বৃষ্টিপাতে তাপমাত্রার সাময়িক স্বস্তি কাটিয়ে দেশজুড়ে আবারও শুরু হয়েছে তীব্র তাপপ্রবাহ। প্রতিদিন লাফিয়ে বাড়ছে পারদ, যার ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গরমজনিত বিভিন্ন রোগব্যাধি ও হিটস্ট্রোকের প্রকোপ বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে এই তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের। বিশেষ করে রিকশাচালক, দিনমজুর এবং নির্মাণ শ্রমিকরা খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে গিয়ে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এতে তাদের দৈনন্দিন আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই বৈরী আবহাওয়ায় শিশু ও বৃদ্ধরা সবথেকে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, জ্বর ও ত্বকের সমস্যা বাড়ছে, আর বড়দের ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। প্রয়োজন ছাড়া রোদে না বের হওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি পানের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্মরণকালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা রয়েছে বাংলাদেশের; ২০২৪ সালে টানা ৩৬ দিনের দাবদাহে অনেক প্রাণহানি ঘটেছিল। চলতি বছরেও গত ২ এপ্রিল বগুড়ায় হিটস্ট্রোকে এক রিকশাচালকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রাণহানির সূচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলগুলোর পূর্বাভাস বলছে, ২১ এপ্রিল থেকে তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে শুরু করবে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম অনুভূত হতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরও ২০ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় চরম উত্তপ্ত বাতাস বয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
দাবদাহের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় টিউবওয়েলে পানি উঠছে না, আবার দক্ষিণাঞ্চলেও পুকুর ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় হাহাকার শুরু হয়েছে। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে লোডশেডিং। জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার কারণে গ্রামীণ জনপদে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। রাজধানীতেও লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়তে থাকায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব জলবায়ু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) জানিয়েছে, ২০২৬ সালে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে আবহাওয়ার চরমভাবাপন্ন আচরণ দেখা দিতে পারে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী তীব্র গরমের পাশাপাশি হঠাৎ ভয়াবহ বজ্রঝড় হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে আবহাওয়া ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।







