যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
তবে যুদ্ধের অবসানে কূটনীতির পথ খোলা রাখার কথাও বলেছেন তিনি। বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বিতর্কে দেওয়া ভাষণে এ অবস্থান তুলে ধরেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে পেজেশকিয়ান এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে দেশটিকে ‘ধ্বংস করে দেওয়া’র হুমকি দেন। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করাকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘তারা বুঝে গেছে, ইরানকে আত্মসমর্পণ করানো যায় না। ইরান কখনোই আগ্রাসী ছিল না, কখনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং আলোচনার টেবিলে বসার ব্যাপারে সবসময়ই তার প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে।’
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমরা কখনো মাথা নোয়াব না, হাঁটু গেড়ে বসব না।’
‘আমরা সন্ত্রাসবাদের শিকার’
ভাষণের শুরুতেই ট্রাম্পের আগের দিনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন পেজেশকিয়ান। ট্রাম্প জাতিসংঘে ইরানকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এর জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমি গতকাল আপনাদের সামনে একটি ভাষণ দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আমাদের সন্ত্রাসী হিসেবে বর্ণনা করলেন। আমরা সন্ত্রাসবাদের শিকার।’
ইরান কখনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং চলমান সংঘাতে তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে—ভাষণে এমন অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিউইয়র্কে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা হয়। পরে ওই আলোচনাকে ‘খুব ভালো’ ও ‘ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প।
খামেনির ছবি দেখালেন পেজেশকিয়ান
ভাষণের শুরুতেই ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ছবি তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর প্রথম দিনেই তেহরানে হামলায় খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হন। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে তাঁদের মরদেহসহ পরিবারের সদস্যদের ছবি প্রকাশ করা হয়।
জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার সময় পেজেশকিয়ান আরও কয়েকটি ছবি দেখান। এর মধ্যে ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় নিহত শিশুদের ছবিও ছিল। এসব ছবি তুলে ধরে তিনি যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন।
জাতিসংঘের ইরানবিষয়ক একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন জানিয়েছিল, ইরানের একটি স্কুল ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় দুটি সামরিক হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার ‘যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি’ রয়েছে। এসব হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেও জানিয়েছিল মিশনটি। পেজেশকিয়ান যে মিনাবের স্কুলটির ছবি দেখান, জাতিসংঘের মিশনের উল্লেখ করা ওই দুটি হামলার একটি ছিল সেই স্কুলে।
পারমাণবিক বোমা নয়, শান্তিপূর্ণ প্রযুক্তির পক্ষে ইরান
ভাষণে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরানের প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি, পারমাণবিক বোমা নয়। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের দেশের জন্য শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি আমাদের অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলছি— পারমাণবিক অস্ত্র নয় এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ওপর কোনো সীমাবদ্ধতাও নয়।’
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান আলোচনায় অন্যতম প্রধান বিরোধের বিষয়। ওয়াশিংটন তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার পাশাপাশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দেওয়ার দাবি করে আসছে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তারা ছাড়বে না।