সোমবার, 5 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ফ্লাইদুবাইয়ের ক্যাপ্টেনকে ‘কুঠার’ দিয়ে হামলা, জানাল আমিরাত

বিবিসি আরবিকে ইসরায়েলের এক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের প্রাথমিক ফলাফলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, হামলাকারীর উদ্দেশ্য ছিল বিমানটিকে বিধ্বস্ত করা। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নেতৃত্বে তদন্তটি পরিচালিত হয়েছে বলে ওই সূত্র জানায়। তেল আবিবে পৌঁছানোর পর বিমানের যাত্রীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ফ্লাইদুবাইয়ের ক্যাপ্টেনকে ‘কুঠার’ দিয়ে হামলা, জানাল আমিরাত
চিত্র: সংগৃহীত

ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানের ককপিটে ক্যাপ্টেনকে হামলা করে উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন সহকারী পাইলট। এ সময় তিনি ‘ক্র্যাশ অ্যাক্স’ বা বিশেষ কুঠার ব্যবহার করেন। পরে যাত্রী ও ক্রুরা হস্তক্ষেপ করে তাকে কাবু করলে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ স্থিতিশীল করা হয়।

শনিবার (৩ অক্টোবর) সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

ঘটনাটি ঘটে ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করা বিমানটিতে ১৭০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন। যাত্রার প্রায় দুই ঘণ্টা পর প্রায় ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা অবস্থায় বিমানটি হঠাৎ ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়। পরে বিমানটি জরুরি সংকেত পাঠায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাবলিক প্রসিকিউটর জেনারেলকে উদ্ধৃত করে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, সহকারী পাইলট ‘সন্ত্রাসী হামলা’ চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বিমানটিকে হঠাৎ তীব্রভাবে নিচের দিকে নামিয়ে দেন। এতে ১৮২ জন আরোহী নিয়ে বিমানটি প্রায় বিধ্বস্ত হতে বসেছিল।

‘ক্র্যাশ অ্যাক্স’ হলো উড়োজাহাজের ককপিটে জরুরি পরিস্থিতির জন্য রাখা বিশেষ ধরনের কুঠার। দুর্ঘটনা বা জরুরি অবস্থায় ককপিট, কেবিন কিংবা বিমানের কোনো অংশ ভেঙে আটকে পড়া যাত্রীদের বের করে আনতেও এটি ব্যবহার করা হয়।

হামলায় গুরুতর আহত হন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। ছুরিকাঘাতে আহত হওয়ার পরও তিনি অবশিষ্ট শক্তি কাজে লাগিয়ে ককপিটের দরজা খুলে দেন। ভেতর থেকে জোরে শব্দ শুনে বাইরে থাকা যাত্রী ও ক্রুরা ককপিটে ঢুকে সহকারী পাইলটকে কাবু করে বেঁধে ফেলেন। এরপর তারা বিমানের নিয়ন্ত্রণ স্থিতিশীল করেন।

ঘটনার পর বিমানটি কিছু সময়ের জন্য জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করলেও পরে সৌদি আরবের দিকে ফিরে যায়। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।

সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চিকিৎসকেরা ছাড়পত্র দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকালে ক্যাপ্টেন ও সহকারী পাইলট দুজনকেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ইউএইর নেতৃত্বে ঘটনার তদন্ত চলছে। ইসরায়েলসহ কয়েকটি দেশও তদন্তে অংশ নিচ্ছে।

ঘটনার তদন্তে সহকারী পাইলটের অতীত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওমানের কর্তৃপক্ষ এর আগে তাকে বিমান চালানো থেকে নিষিদ্ধ করেছিল। তার মধ্যে উগ্রপন্থি মতাদর্শ গ্রহণের লক্ষণ দেখা যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যক্তি জানান, পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাই তাকে নিয়োগ দেয়। তবে নিয়োগের সময় তার কতটা যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি। ওমানের পক্ষ থেকে তাকে বিমান চালানো থেকে নিষিদ্ধ করার খবর প্রথম প্রকাশ করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

ওমানের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ওই ব্যক্তি দেশটির জাতীয় বিমান সংস্থায় কাজ করতেন। উগ্রপন্থি মতাদর্শের প্রতি তার ঝোঁকের লক্ষণ দেখা যাওয়ার পর তাকে বিমান চালানো থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাকে ওমান এয়ারে প্রশাসনিক কাজে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

সহকারী পাইলট কীভাবে ইসরায়েলগামী ওই ফ্লাইটের ককপিটে কাজ করছিলেন, তা এখন তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, যেসব দেশের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, সেসব দেশের পাইলটদের ইসরায়েলের আকাশসীমায় প্রবেশ ঠেকাতে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে। ইসরায়েল ও ওমানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

নেতানিয়াহুও পরে স্বীকার করেছেন, ওই সহকারী পাইলট কীভাবে ফ্লাইটে ছিলেন, তা নিয়ে একটি ফাঁক ছিল। আমিরাত সরকারের সহযোগিতায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সহকারী পাইলটের হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা খুঁজে বের করতে মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশের নিরাপত্তা সংস্থা কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশও এতে সহায়তা করছে।

শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ঘটনাটিকে ‘বিপজ্জনক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেন।

সহকারী পাইলটের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি ফ্লাইট পরিচালনার দিন পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। পরে সেটি মুছে দেওয়া হয়।

ইসরায়েলও ঘটনাটি নিয়ে পৃথক তদন্ত করেছে। বিবিসি আরবিকে ইসরায়েলের এক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের প্রাথমিক ফলাফলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, হামলাকারীর উদ্দেশ্য ছিল বিমানটিকে বিধ্বস্ত করা। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নেতৃত্বে তদন্তটি পরিচালিত হয়েছে বলে ওই সূত্র জানায়। তেল আবিবে পৌঁছানোর পর বিমানের যাত্রীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুক্রবার মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, সহকারী পাইলট ‘ইসলামপন্থি উগ্রবাদে’ জড়িয়ে পড়েছিলেন। তার ভাষ্য, ওই ব্যক্তি ‘খুব সম্ভবত’ বিমানটিকে ভূপাতিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।

নেতানিয়াহু বলেন, যাত্রী ও ক্রুরা হামলাকারীকে কাবু করে বেঁধে ফেলার পর তিনি ক্রুদের উদ্দেশে বারবার বলছিলেন, ‘আমাকে মেরে ফেলো, আমাকে মেরে ফেলো।’ তিনি বলেন, এ থেকে ‘প্রশ্নাতীতভাবে স্পষ্ট’ যে ওই ব্যক্তি আত্মঘাতী হতে চেয়েছিলেন।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘উড়োজাহাজটিতে অনেক যাত্রী ছিলেন। এর সঙ্গে আমি যে ইসলামপন্থি প্রবণতা ও তার অতীতে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হওয়ার যেসব তথ্য পাওয়ার কথা বললাম, সেগুলো মিলিয়ে দেখলে... আমার মনে হয়... আমরা একটা বেশ ভালো সূত্র পেয়ে যাব।’

তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনই কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না বলেও জানান তিনি। ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই কিছু বললে সেটি খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।’

এদিকে ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাই বিমানের ককপিটে সংঘাতের ঘটনাকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের যৌথ ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বলে দাবি করেছে ইরান।

‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বলতে এমন একটি সাজানো ঘটনাকে বোঝায়, যার দায় অন্য পক্ষের ওপর চাপানোর উদ্দেশ্যে সেটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়। তেহরানের অভিযোগ, রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং ইরানের ওপর দায় চাপানোর উদ্দেশ্যেই ঘটনাটি সাজানো হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করা এবং ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের অজুহাত তৈরির লক্ষ্যেই নেতানিয়াহু এ পরিকল্পনা করেছেন বলে অভিযোগ তেহরানের।

প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, ঘটনার এক দিন আগে গোপনে আবুধাবি সফর করেন নেতানিয়াহু। সেখানে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এর পরদিন দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটে ককপিটে সংঘাতের ঘটনা ঘটে।

ইরানের অভিযোগ, ককপিটের ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে তুলে ধরে ওমানের নাগরিক সহকারী পাইলটকে ‘চরমপন্থি’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু।

তেহরান আরও দাবি করেছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৯/১১ হামলার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং এর পেছনে ইরানের হাত থাকার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও ‘ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ ঘটনার পেছনে ইরানের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে তারা সরাসরি তেহরানকে দায়ী করেননি।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, হামলায় ইরানের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে দেশটির ওপর ‘কঠোর আঘাত’ হানা হবে। অন্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, এ ঘটনায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ঘটনাটির সঙ্গে কোনো ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা উদ্দেশ্যে’র যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।

ঘটনার পর ছুরিকাঘাতে আহত ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ‘নায়ক’ বলে অভিহিত করেছেন নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল হাসপাতালে গিয়ে মাচ্ছারের সঙ্গে দেখা করেন। পরে ভারতীয় দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, তিনি সুস্থ আছেন এবং সেরে উঠছেন।