ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক বিধবার কাছ থেকে টিপসই নিয়ে ভুয়া কাবিননামা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আব্দুল কুদ্দুস ও আবদুস ছাত্তার নামে দুজনকে অভিযুক্ত করে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন পাঁচ সন্তানের জননী আছিয়া খাতুন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ফুলবাড়ীয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওই নারী লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযুক্তরা হলেন আব্দুল কুদ্দুস ও আবদুস ছাত্তার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভুক্তভোগী আছিয়া বেগমের বাড়ি উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামে। প্রায় ১২ বছর আগে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়। পাঁচ সন্তানকে নিয়ে সংসার চালিয়ে আসছেন তিনি। তাঁর তিন ছেলের বিয়ে হয়েছে এবং নাতি-নাতনিও রয়েছে। তাঁর সবার ছোট ছেলের বয়স ১৩ বছর।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে বিয়ের প্রস্তাব পেলেও আছিয়া বেগম তাতে রাজি হননি। প্রায় চার বছর আগে তাঁর মেজ ছেলে আসাদুলের বিয়ের সময় প্রতিবেশী আব্দুল কুদ্দুসকে উকিল শ্বশুর করা হয়। আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে তিনি প্রায়ই তাঁদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। পরে আব্দুল কুদ্দুস একাধিকবার স্থানীয় আবদুস ছাত্তারের মাধ্যমে আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তবে প্রতিবারই তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় দেড় মাস আগে আবদুস ছাত্তার বর্তমান সরকারের ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে নিরক্ষর আছিয়া বেগমকে নিজের দোকানে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি নেওয়া হয়। কয়েক দিন পর একটি খাতায় তাঁর কাছ থেকে দুটি টিপসইও নেওয়া হয়।
সম্প্রতি আছিয়া বেগম ও আব্দুল কুদ্দুসের বিয়ে হয়েছে—এমন একটি এফিডেভিট ও কাবিননামার কাগজ দেখিয়ে গ্রামে প্রচার করেন আবদুস ছাত্তার। পরে এ ঘটনায় আছিয়া স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও সভাপতির কাছে অভিযোগ করেন।
গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় পাটুলী গ্রামে আছিয়ার বাড়িতে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাঁর কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন। অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার উপস্থিত না থাকায় পরবর্তী সালিশের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ৭ অক্টোবর।
সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, আছিয়া বেগমের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাঁকে ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে এফিডেভিট ও ভুয়া কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী অফিসের সিলযুক্ত কাবিননামায় দেনমোহর ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং নগদ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ওই কাবিননামায় আব্দুল মান্নান ও সাইফুল ইসলাম নামে দুজনকে সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে তাঁরা কেউই এ বিষয়ে জানেন না বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় টাকার বিনিময়ে আবদুস ছাত্তার কাজটি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি আব্দুল হেকিম মাস্টারেরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। সালিশে আবদুস ছাত্তারকে উপস্থিত থাকতে বলা হলেও তিনি সেখানে যাননি।
অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার নিজেকে জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর একটি প্রসাধনসামগ্রীর দোকান রয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ওই নারীর কাছ থেকে কোনো টিপসই নেননি। এলাকার জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে।
উপজেলা জামায়াতের আমির ফজলুল হক শামীম জানান, ঘটনাটি জানার পর স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। আবদুস ছাত্তার জামায়াতের নিয়মিত কোনো পদধারী নেতা নন। নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও জানান ফজলুল হক।
তিনি আরও বলেন, তাঁদের ধারণা, আবদুস ছাত্তার এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত। তবে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে থানায় অভিযোগ দায়েরের পর থেকে আব্দুল কুদ্দুস ও আবদুস ছাত্তার আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ কারণে অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে আবদুস ছাত্তার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরেই তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে।
ফুলবাড়ীয়া থানার উপপরিদর্শক মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি পুটিজানা ইউনিয়নের বিট কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।