পোশাক খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে দেশের পণ্য রপ্তানি আয়ের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। নানা সংকটের মধ্যেও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চতুর্থ মাস অক্টোবরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৯৯ কোটি ১৮ লাখ ডলার (৩.৯৯ বিলিয়ন)। গত বছরের একই মাসের তুলনায় এ আয় ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি। আর অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেড়েছে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) রোববার প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে জানিয়েছে, অক্টোবরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩১৬ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। গত বছরের একই মাসের তুলনায় এ আয় ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবরেও রপ্তানি আয় বেড়েছে, যা ইতিবাচক। মাঝখানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা থাকলেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে পোশাক রপ্তানির ভরা মৌসুম চলছে।
তিনি বলেন, “অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাস আমরা সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করি। সে বিবেচনায় ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে।”
গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর শুরু হয়েছিল রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দিয়ে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকেরা পণ্য রপ্তানি করে আয় করেন ৪৭২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ আয় প্রায় ১ শতাংশ কম ছিল। প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক থেকে আয় কমেছিল প্রায় ২ শতাংশ।
দ্বিতীয় মাস আগস্টে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয় ৪৪২ কোটি ৯৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে আয় দাঁড়ায় ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ ডলারে। ওই মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত, দেশের সার্বিক রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ সময়ে পণ্য রপ্তানি করে মোট ১ হাজার ৭০৮ কোটি ৫৯ লাখ ডলার (১৭.০৮ বিলিয়ন) আয় হয়েছে। আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ১ হাজার ৬১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার (১৬.১৪ বিলিয়ন)।
তবে এর আগের অর্থবছর শেষ হয়েছিল নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে। গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি ১৯ লাখ ডলার (৪৮ বিলিয়ন), যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। ওই সময়ে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমেছিল ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সার্বিকভাবে গত অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি আয় প্রায় ১৩ শতাংশ কম ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ওই অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার (৫৫ বিলিয়ন) আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল।
চলতি অর্থবছরে বিএনপি সরকার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৫ হাজার ৫২০ কোটি ডলার (৫৫.২০ বিলিয়ন)। গত অর্থবছরের প্রকৃত আয়ের তুলনায় এ লক্ষ্য ১৫ শতাংশ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ১২.১০ শতাংশ
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ আসে এ বাজার থেকে।
ইপিবির দেশভিত্তিক রপ্তানি আয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাল্টা শুল্কসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাড়ছে।
অক্টোবরে দেশটিতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৭৫ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার। গত বছরের একই মাসের তুলনায় এ আয় ১২ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। আর সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেড়েছে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৭২ কোটি ৪০ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৭ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
চলতি অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ৭২ কোটি ৪০ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। ওই মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ।
এর আগের মাস আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৯৪ কোটি ৮৮ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ২৬ দশমিক ০৯ শতাংশ বেশি।
অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি বেড়েছিল শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। ওই মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। আগের বছরের একই মাসে এ আয় ছিল ৯১ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।
জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ। এ সময়ে দেশটিতে মোট ৩৩৪ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
এদিকে অক্টোবরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ০২ শতাংশ। জার্মানি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও তুরস্কে রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ৫৯, ১২ দশমিক ৪৬, ১০ দশমিক ৯৬ ও ৪৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ফ্রান্সে রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমেছে, ১৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। পোল্যান্ডে কমেছে ২ দশমিক ৩১ শতাংশ, কানাডায় ২ দশমিক ০৮ শতাংশ, জাপানে শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ভারতে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ।
মোট রপ্তানি আয়ের ৭৯.৩৬ শতাংশ এসেছে পোশাক থেকে
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের অক্টোবর মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩১৬ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। ওই মাসে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৩৯৯ কোটি ১৮ লাখ ডলার। সে হিসাবে অক্টোবরে মোট রপ্তানি আয়ের ৭৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
এ মাসে নিট পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৭৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, যা গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এ খাতে আয় হয়েছে ১৪০ কোটি ২৫ লাখ ডলার।
জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৩৭৪ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। এ আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ বেশি। গত বছরের প্রথম চার মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১ হাজার ২৯৯ কোটি ৩ লাখ ডলার।
অন্যান্য খাতের রপ্তানি আয়
তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্যের মধ্যে অক্টোবরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, ২৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ ছাড়া বাইসাইকেল রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৬২ শতাংশ।
তবে কয়েকটি খাতে রপ্তানি আয় কমেছে। অক্টোবরে হোম টেক্সটাইল রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। প্লাস্টিক পণ্যে কমেছে ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ, কৃষিপণ্যে ১৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ২৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।