গত সপ্তাহে ভারতের শেয়ারবাজারে সাময়িক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও সেই পরিস্থিতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সোমবার (১৯ অক্টোবর) লেনদেন চলাকালে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে দেশটির শেয়ারবাজার। এতে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৪ লাখ কোটি রুপি মূল্যমানের সম্পদ কমে গেছে। ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের দরপতন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিকভাবে মূলধন প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্যকে এ পতনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সময় সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে লেনদেন শেষ হওয়ার আগে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) প্রধান সূচক সেনসেক্স প্রায় ১ হাজার পয়েন্ট কমে যায়। একই সময়ে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) নিফটি ৫০ সূচক হারায় ২৯৫ পয়েন্ট। এর মধ্য দিয়ে টানা দুই দিনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার অবসান ঘটে। বড় কোম্পানির শেয়ারের পাশাপাশি নিফটি মিডক্যাপ ১০০ ও নিফটি স্মলক্যাপ ১০০ সূচকেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়।
গত শুক্রবার লেনদেন শেষে বিএসইতে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূল্য ছিল ৪ কোটি ৭২ লাখ ৬২ হাজার ১৬৭ কোটি রুপি। সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে তা কমে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৮ লাখ ১৭ হাজার ৯৯৫ কোটি রুপিতে। এতে বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৪ লাখ কোটি রুপি।
পতনের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বল শেয়ারদর, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধন প্রত্যাহার—এই তিনটি বিষয় ভারতের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
ব্যাংকিং খাতে বড় দরপতন
সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এর প্রভাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শেয়ার থেকে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়া হয়। এইচডিএফসি ব্যাংক, আইসিআইসিআই ব্যাংক ও অ্যাক্সিস ব্যাংকের শেয়ারদর কমে যাওয়ায় সেনসেক্সের মোট পতনের অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে বলে জানা গেছে।
সোমবার এইচডিএফসি ব্যাংকের শেয়ারদর প্রায় ৩ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে প্রত্যাশা অনুযায়ী আর্থিক ফল না করায় অ্যাক্সিস ব্যাংকের শেয়ারদর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়।
তেলের দাম বাড়ায় উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ থেকে ১০৯ ডলারে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার খবর এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য তেলের উচ্চমূল্য আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধন প্রত্যাহার
ভারতের শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতাও অব্যাহত রয়েছে। চলতি অক্টোবর মাসে এ পর্যন্ত বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (এফপিআই) ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ৫২ হাজার ১০০ কোটি রুপি প্রত্যাহার করেছেন। চলতি বছরের অন্যতম সর্বোচ্চ প্রত্যাহারের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে এটিকে।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে প্রায় ৩৫ হাজার ৮৬১ কোটি রুপি তুলে নিয়েছিলেন। ধারাবাহিকভাবে বিদেশি মূলধন বেরিয়ে যাওয়ায় বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অভিনব ত্রিপাঠীর মতে, আগামী দিনগুলোতে ভারতের শেয়ারবাজারের গতিপথ নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহের ওপর।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চপর্যায়ে থাকলে ভারতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো কঠিন হবে। এতে সাম্প্রতিক ধাক্কা সামলে শেয়ারবাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর পথও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।