ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে চারটি পণ্যবাহী উড়োজাহাজে করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পাঠিয়েছে পাকিস্তান। গত সেপ্টেম্বরে এসব অস্ত্র ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনে পৌঁছায়। সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী যখন হুতিদের কাছ থেকে হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে, তখন পাকিস্তানের এই সামরিক সহায়তার খবর সামনে এল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত শুক্রবার জানায়, পাকিস্তানের পাঠানো অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীকে সহায়তা দিতে পাকিস্তানের সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। এর ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে চলমান বহুজাতিক সংঘাতে পাকিস্তান আরও সরাসরি যুক্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। বেশ কয়েকজন পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরো অঞ্চল হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর তা মোকাবিলায় সৌদি আরব সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের তাইজ শহরের আশপাশে তীব্র লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার তাইজে সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় একটি সেতু ধ্বংস করে হুতিরা। সেতুটি শহরটির সঙ্গে এডেনের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। তাইজ পুরোপুরি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে গেলে উত্তরের সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর সঙ্গে এডেনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এতে সরকারি বাহিনীর রসদ সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবও বিমান হামলা বাড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার হুতিরা দাবি করে, আগের ২৪ ঘণ্টায় সৌদি বাহিনী তাদের অবস্থানে ৯৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। একই দিন সৌদি আরব জানায়, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় তাদের সামরিক বাহিনী ‘গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান’ চালিয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, ইয়েমেনের সাদা শহরের ১১টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। তাইজে একটি ‘সমন্বিত সামরিক ব্যবস্থার’ ওপর ২৭টি বিমান হামলা চালানোর কথাও জানানো হয়। পাল্টা হুতিরাও সৌদি আরবের বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রিয়াদ বিমানবন্দরও রয়েছে।
এরই মধ্যে মদিনার একটি বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্রে হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে সৌদি আরব। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, একটি ড্রোন তাইবাহ বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্রে আঘাত হানে। ওই কেন্দ্র থেকে পবিত্র মসজিদে নববিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে হুতিরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে পাকিস্তান ও তুরস্ক কতটা সামরিক সহায়তা করে, সেটিও এখন বিশেষভাবে নজরে রাখা হচ্ছে। গত আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা চুক্তি’ নামে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। হুতিদের বিরুদ্ধে সমন্বিত সহায়তা এই চুক্তির কার্যকারিতার প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে।
পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে কয়েক দশকের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে ইয়েমেন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পাশাপাশি তুরস্কের ভূমিকা নিয়েও এখন আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার এখনো যুক্তরাষ্ট্র। হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান না নিলেও পাকিস্তানের মতো যুক্তরাষ্ট্রও সৌদি আরবে সামরিক উপদেষ্টা ও অস্ত্রব্যবস্থা পাঠিয়েছে।
হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব একই সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্রদেরও পাশে টানার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে এ সপ্তাহে প্রকাশ্য উদ্যোগ নিয়েছে রিয়াদ। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে দুই উপসাগরীয় দেশের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মনসুর বিন জায়েদ সৌদি আরব সফর করেন। গত মঙ্গলবার রিয়াদে তাঁকে স্বাগত জানান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।