আটলান্টিকের বুক চিরে সগৌরবে এগিয়ে যাচ্ছিল তৎকালীন পৃথিবীর বৃহত্তম একটি জাহাজ। তখনকার দুনিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অনন্য নিদর্শন, যাকে বলা হতো 'আনসিংকেবল' বা যে জাহাজ ডোবে না। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে ১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল মধ্যরাতে টাইটানিক প্রমাণ করে দিল, প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের দম্ভ কতটুকু তুচ্ছ। আটলান্টিকের মহাসাগরে পানির নিচের একটি বিশাল বরফ খন্ডের সাথে সংঘর্ষে জাহাজটি ডুবে যায়।
টাইটানিক কেবল একটি জাহাজ ছিল না, এটি ছিল ভাসমান এক রাজপ্রাসাদ। হোয়াইট স্টার লাইন কোম্পানির তৈরি এই জাহাজটির নির্মাণশৈলী ছিল অবিশ্বাস্য। দৈর্ঘ্য: ৮৮২ ফুট ৯ ইঞ্চি, উচ্চতা: জলের উপরিভাগ থেকে ডেক পর্যন্ত প্রায় ১৭৫ ফুট। জাহাজটিতে ছিল জিমনেসিয়াম, সুইমিং পুল, লাইব্রেরি এবং উচ্চমানের ক্যাফে। প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের জন্য ছিল তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আভিজাত্যের ব্যবস্থা।
যেভাবে ডুবে যায় ভাসমান এই রাজপ্রাসাদ
১০ এপ্রিল ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে টাইটানিক। যাত্রার চতুর্থ দিন, অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল রাত ১১:৪০ মিনিটে নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে আটলান্টিক মহাসাগরে এক বিশাল হিমশৈলের (Iceberg) সাথে জাহাজটির সংঘর্ষ হয়। জাহাজের লুকআউট ফ্রেডরিক ফ্লিট যখন হিমশৈলটি দেখতে পান, তখন তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দূরত্বে। সংঘর্ষটি সরাসরি মাঝখানে না হয়ে, আঘাত করেছিল জাহাজের পাশের দিকে। জাহাজের নিচের ১৬টি ওয়াটার-টাইট কম্পার্টমেন্টের মধ্যে ৫টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪টি ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাহাজটি ভেসে থাকার সক্ষমতা রাখত, কিন্তু ৫টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়ায় এর ডুবে যাওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে।
জাহাজে থাকা লাইফবোটের সংখ্যা ছিল মাত্র ২০টি, যা মোট যাত্রীর অর্ধেকের জন্য যথেষ্ট ছিল না।৪. শেষ মুহূর্ত: রাত ২:২০ মিনিটে জাহাজটি দুই টুকরো হয়ে গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যায়। সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা ছিল তখন -২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে ৫-১০ মিনিটের বেশি বেঁচে থাকা অসম্ভব ছিল। তথ্য সতর্কবার্তা উপেক্ষা ঘটনার দিন টাইটানিক অন্তত ৬টি হিমশৈলের সতর্কবার্তা পেয়েছিল, কিন্তু রেডিও অপারেটররা তা গুরুত্ব দেননি। প্রথম যে লাইফবোটটি নামানো হয়, তাতে ৬৫ জনের ধারণক্ষমতা থাকলেও মাত্র ২৮ জন যাত্রী ছিলেন।বেঁচে ফেরাজাহাজে থাকা ২,২২৪ জন যাত্রীর মধ্যে মাত্র ৭০৬ জন বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন। বাকি ১৫০০-র বেশি প্রাণ হারান।
একটি ব্যান্ডদল বাজিয়েছিল জীবনের অন্তিম সুর
যখন ডুবছিল, তখনও মিউজিশিয়ানরা ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে গান বাজিয়ে যাচ্ছিলেন যাতে যাত্রীদের আতঙ্ক কিছুটা কমানো যায়। এই সুর যেন মৃত্যুকে উপেক্ষা করে জীবনের সমাপ্তিকে অভিবাদন জানাচ্ছিল। মিউজিশিয়ানদের কেউই বাঁচেননি। প্রত্যেকের সলিল সমাধি হয়ে টাইটানিকের সাথেই।
যেকারণে আজও টাইটানিক আলোচনায়
১৯৮৫ সালে সমুদ্রের তলদেশে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার পর এই ট্র্যাজেডি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। টাইটানিকের এই করুণ পরিণতির পর আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বদলে যায় এবং প্রতিটি জাহাজে পর্যাপ্ত লাইফবোট রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়।টাইটানিক আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তিও প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের কাছে ম্রিয়মাণ। শত বছর পেরিয়ে গেলেও এই ট্র্যাজেডি আজও এক রহস্যময় শোকগাথা হয়ে আছে আটলান্টিকের ৩,৮০০ মিটার পানির নিচে।