সীমান্তবর্তী আফগানিস্তানের ভূখণ্ড থেকে উড়ে আসা বিস্ফোরকবাহী আটটি চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে সীমান্ত গলিয়ে পাকিস্তানের সীমানায় প্রবেশের চেষ্টাকালে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির একটি সশস্ত্র বহরকে প্রতিহত করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতে দেশটির উত্তর-পশ্চিমের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের তোরখাম সীমান্ত অঞ্চলে চারটি এবং কোহাট এলাকায় আরও চারটি ড্রোন হামলা চালানোর চেষ্টা করে কাবুলের প্রতিরক্ষা বাহিনী। তবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পূর্বেই পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে সেগুলোকে আকাশেই নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও প্রকাশ, ওই ড্রোন হামলার সমান্তরালে খাইবার পাখতুনখোয়ার কুররম সীমান্ত পথ দিয়ে টিটিপির একটি দল পাকিস্তানের সীমানায় প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছিল। তবে দেশটির সীমান্তরক্ষী ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর তাৎক্ষণিক তৎপরতায় সেই অনুপ্রবেশের প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যায়।
সামরিক সূত্রগুলোর দাবি, অনুপ্রবেশের ছক বানচাল হয়ে যাওয়ার পর কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ছাড়াই পাক-আফগান সীমান্তরেখায় অবস্থিত পাকিস্তানি সামরিক তল্লাশিচৌকিগুলোতে নির্বিচারে গুলি ও ভারী কামানের গোলাবর্ষণ করতে থাকে আফগান বাহিনী।
এই অতর্কিত হামলার বিপরীতে কঠোর জবাব হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সদস্যরা আফগান বাহিনীর একাধিক সীমান্তবর্তী ঘাঁটি, মর্টার ছোঁড়ার অবস্থান এবং সামরিক অবকাঠামোর ওপর লক্ষ্যভেদী আঘাত হানে বলে নিশ্চিত করেছে পাকিস্তানের সেনাদপ্তর।
ঐতিহাসিক, ভাষাগত এবং ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে প্রতিবেশী এই দুই দেশের মধ্যে একদা গভীর সদ্ভাব বিরাজ করলেও টিটিপি গোষ্ঠীর তৎপরতাকে ঘিরে বিগত অর্ধদশকে সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটেছে, যার সূচনা মূলত ২০২১ সালে কাবুলে তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে। ইসলামাবাদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নাশকতা ও সংঘাত জিইয়ে রাখতে আফগান প্রশাসন টিটিপিকে নানাভাবে মদদ জুগিয়ে যাচ্ছে। যদিও কাবুলের ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ বরাবরই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছে।
উদ্ভুত সংকট সমাধানে দুই দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও প্রতিনিধি পর্যায়ে একাধিক দফায় আনুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও স্থায়ী কোনো সুরাহা মেলেনি। এমন বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেই গত ২৬ ফেব্রুয়ারি খাইবার পাখতুনখোয়ায় সীমান্তে অতর্কিত অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি জওয়ানকে হত্যা এবং কয়েকজনকে বন্দি করে নিয়ে যায় আফগান সেনা সদস্যরা।
এর প্রত্যুত্তরে তালেবান কর্তৃপক্ষকে সমঝে দিতে অবিলম্বে সামরিক অভিযান অপারেশন গজব-লিল হক শুরু করে ইসলামাবাদ। ওই সময় টানা কয়েক দিনব্যাপী বিমান হামলা চালিয়ে আফগান ভূমিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী।
পরবর্তীকালে বেশ কিছুদিন উভয় পক্ষ সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলায় সীমান্তে এক ধরনের সাময়িক শান্তি ফিরে এসেছিল। তবে সম্প্রতি কোহাটের পুলিশ সদর দপ্তরের জামে মসজিদে জুমার প্রার্থনার সময় প্রাণঘাতী এক আত্মঘাতী গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে সেই পরিস্থিতি পুনরায় চরম অশান্ত হয়ে ওঠে। ওই ভয়াবহ ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষসহ একত্রিশ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে এবং জখম হন শতাধিক। ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই আত্মঘাতী তাণ্ডবের দায় স্বীকার করে প্রকাশ্য ঘোষণা দেয় টিটিপি, যা নতুন করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে।