সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও স্থায়ী বন্যার কারণে ঢাকা, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারানোর ‘তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে’ রয়েছেন। গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘ মহাসচিবের ‘চ্যালেঞ্জ রিলেটেড টু সি লেভেল রাইজ অ্যান্ড ওয়েই অ্যান্ড অ্যাপ্রোচেস টু অ্যাড্রেস ইট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এরই মধ্যে নগর অবকাঠামো, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবহন নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ গ্রিড, ভবন এবং ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এর প্রভাব পড়ছে মানবাধিকার, উন্নয়ন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপ অঞ্চলের শহরগুলো এ সংকটের বড় প্রভাবের মুখে পড়ছে। ভারতের কলকাতা ও মুম্বাই এবং বাংলাদেশের ঢাকায় বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা। স্থায়ী বন্যার কারণে এসব শহরের ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ বাসস্থান হারানোর তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে রয়েছেন।
অঞ্চলভেদে ঝুঁকির ধরন ভিন্ন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব ও ঝুঁকির ধরন অঞ্চলভেদে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি ও নিউইয়র্ক এবং চীনের গুয়াংঝুর মতো উচ্চ আয়ের উপকূলীয় শহরগুলোতে আনুমানিক ২ লাখ কোটি থেকে সাড়ে ৩ লাখ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদ ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর ক্ষেত্রে প্রধান উদ্বেগ মানুষের বাস্তুচ্যুতি।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৭ মিলিমিটার করে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এই বৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৯ মিলিমিটারে পৌঁছে নতুন রেকর্ড তৈরি করে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, সামুদ্রিক উষ্ণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াই ২০২৪ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির এই নতুন রেকর্ডের অন্যতম কারণ। ২০১২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ মিলিমিটার। ২০২৫ সালেও বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০২৪ সালের রেকর্ড ব্যবধানের কাছাকাছি ছিল।
চরম ঝুঁকিতে ৭৭ কোটি মানুষ
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৭৭ কোটি মানুষ এমন উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করেন, যেগুলো জোয়ারের উচ্চসীমার চেয়ে ৫ মিটারেরও কম উঁচুতে অবস্থিত। ফলে তারা চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। এই জনগোষ্ঠী বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় বন্যা, মিষ্টি পানির লবণাক্তকরণ, নদীভাঙন এবং বাস্তুতন্ত্রের অবনতি আরও তীব্র হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপরও।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কারণে পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ, আঘাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে ভূমি দেবে যাওয়ার প্রভাব যুক্ত হয়ে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে সমুদ্রের লোনা পানি উপকূলীয় এলাকার মাটি ও সুপেয় পানির কূপে ঢুকে সেগুলো দূষিত করতে পারে।
এ ধরনের লবণাক্ততার ফলে পানীয় জলের নিরাপত্তা, কৃষি ও সেচব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধু বসতবাড়ি ও নগর অবকাঠামোর জন্য নয়, মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।