শুক্রবার, 25 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

গাজা পুনর্গঠনে ২৪৫ কোটি ডলারের পরিকল্পনা ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসের

আগামী এক দশকে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে এবং অবকাঠামো পুনঃনির্মাণ করতে কমবেশি ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিলের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

গাজা পুনর্গঠনে ২৪৫ কোটি ডলারের পরিকল্পনা ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসের
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের চলমান সম্মেলনের ফাঁকে আয়োজিত এক নীতিগত সভায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক গঠিত আন্তর্জাতিক পিস বোর্ড বা শান্তি পরিষদ বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রায় ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল আর্থিক রূপরেখা উন্মোচন করেছে।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে ছেষট্টিটি সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে এই অর্থ ব্যয় করা হবে, যার প্রাথমিক অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে বিধ্বস্ত এলাকায় ঘরবাড়ি নির্মাণ, ডিজেলচালিত প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জমা হওয়া ধ্বংসাবশেষ ও আবর্জনা অপসারণের মতো অপরিহার্য ক্ষেত্রগুলো।

তবে উদ্যোক্তারা স্বীকার করেছেন, লক্ষ্য অর্জনে এখনো বিপুল পরিমাণ অনুদানের ঘাটতি রয়েছে। এযাবৎকাল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আঠারো বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও বাস্তবে মাত্র ২৮০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল ছাড় হয়েছে। পরিষদের নিজস্ব প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে এবং অবকাঠামো পুনঃনির্মাণ করতে কমবেশি ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিলের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

বোর্ড অব পিসের কার্যকর শাখা ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’-এর প্রতিনিধি এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার খোলামেলাভাবে স্বীকার করেন যে, জটিল বাস্তবতায় এই কর্মপরিকল্পনা বহু জায়গায় সময়ক্ষেপণের শিকার হয়েছে। তিনি জানান, নানা প্রতিকূলতা ও বাস্তবিক কারণে একাধিক ক্ষেত্রে কাজে স্থবিরতা এসেছে। অংশীজনদের উদ্দেশে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, উপস্থিত প্রতিনিধিদের সামনে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার তুলে ধরা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা যে সম্পূর্ণ নিবেদিত, তা প্রমাণ করাই ছিল এই সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য।

আলোচনাকালে নিউইয়র্কে তাঁর পাশে উপস্থিত মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ দাবি করেন, গত এক বছরে তাদের সমন্বিত উদ্যোগে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে আটক সব জিম্মি নিরাপদে স্বজনদের কাছে ফিরেছে, শত ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একটি যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে রয়েছে এবং ইতিহাসের অন্যতম নজিরবিহীন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সেখানে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া মানুষের তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ও প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

তহবিল সংগ্রহের বড় চ্যালেঞ্জ বাদেও এই প্রকল্পটির সামনে আরও বেশ কয়েকটি জটিল প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। যার মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় কর্মরত কর্মীদের সার্বিক সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ শাসন কাঠামোর প্রশাসনিক সংস্কার এবং তেলআবিব ও ফিলিস্তিনি নীতিনির্ধারকদের অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এনে মতৈক্য প্রতিষ্ঠা অন্যতম।

অন্যদিকে বুধবার আয়োজিত পৃথক এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মন্তব্য করেন যে, সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু বন্ধুরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এই মহৎ পদক্ষেপে আরও বৈশ্বিক পক্ষকে অংশীদার করতে পরিষদটি আগ্রহ প্রকাশ করছে।

বিবিসির একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে পরিষদের ইসরায়েলি-আমেরিকান প্রতিনিধি মাইকেল আইজেনবার্গ তাদের পরবর্তী অগ্রাধিকার স্পষ্ট করে জানান, যেহেতু পুরো অঞ্চলটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, তাই সবার আগে সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবিস্ফোরিত বোমার ধ্বংসাবশেষ ও মারণাস্ত্র অপসারণ জরুরি। পাশাপাশি মাটির নিচে থাকা কয়েকশত কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ অকার্যকর করতে হবে। এসব প্রাথমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল স্থানীয় বাসিন্দাদের আবাসন, স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন ও জরুরি নাগরিক পরিকাঠামো তৈরির কাজে যুক্ত করা যাবে।

এর আগে গত আগস্ট মাসে পরিষদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিকোলায় ম্লাদেনভ গাজার বুকে ইসরায়েলের নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলার পাশাপাশি সশস্ত্র দল হামাসের আগ্রাসী কার্যকলাপেরও কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছিলেন, পূর্ববর্তী বছরের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি কোনো কারণে ভেঙে পড়লে পুরো অঞ্চল একটি অপরিবর্তনীয় ও বিধ্বংসী বিপদের মুখে পড়বে।

এদিকে যুদ্ধবিরতি চলাকালীনও ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সংগৃহীত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকান মধ্যস্থতার পর থেকেও ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর অনবরত হানায় অন্তত ১ হাজার ৩৮১ জন বেসামরিক ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় তিন শতাধিক কোমলমতি শিশু রয়েছে। নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে জাতিসংঘও এই হতাহতের খতিয়ানকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। বিপরীতে ইসরায়েলি বাহিনীর ভাষ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে লড়াই করতে গিয়ে তাদের পাঁচজন সেনা সদস্য এবং একটি দুর্ঘটনাজনিত কারণে এক ঠিকাদার নিহত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যৌথভাবে প্রস্তাবিত বিশ দফা গাজা শান্তি ফর্মুলার হাত ধরেই এই শান্তি পরিষদের জন্ম হয়। সে সময় ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে গাজায় থাকা অবশিষ্ট আটচল্লিশজন ইসরায়েলি জিম্মিকে হস্তান্তরে রাজি হয়েছিল হামাস এবং উপত্যকার শাসনভার একদল অরাজনৈতিক টেকনোক্র্যাট পরিষদের হাতে সোপর্দ করার বিষয়েও তারা সম্মতি জ্ঞাপন করেছিল।

গত জুলাইয়ে হামাস নিজেদের নিরস্ত্রীকরণে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করে জানায় যে, তারা সব অস্ত্র পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত, যদি তেলআবিব সব প্রকার সামরিক আধিপত্য ও আগ্রাসন থামিয়ে অবিলম্বে গাজার সীমানা থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়।

তবে তেলআবিবের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই শর্ত খারিজ করে উল্টো দাবি তোলেন যে, হামাসের সমরাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনারা গাজা ত্যাগ করবে না। প্রাথমিক অবস্থায় শান্তি পরিষদকে কেবল ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনে একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে ভাবা হলেও পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যান্য আঞ্চলিক বিবাদ মেটানোর লক্ষ্যেও এর পরিধি আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি