দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হৃদ্যন্ত্রের নানা জটিলতা। চিকিৎসকদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেড় কোটির বেশি মানুষ এই ব্যাধিতে ভুগছেন। সামগ্রিক মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঘটছে হৃদরোগে। একসময় এই সমস্যা কেবল প্রবীণদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও এখন তরুণ সমাজেও অস্বাভাবিক রক্তচাপ ও হৃদরোগের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
হৃদরোগের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম উচ্চরক্তচাপ। এটি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রান্তিক পর্যায়ে পরিচালিত অসংক্রামক রোগ বা এনসিডি সেবা কেন্দ্রগুলোতে তীব্র ওষুধসংকটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বেশ কিছু উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্তমানে যে পরিমাণ প্রতিষেধক রয়েছে, তা দিয়ে সর্বোচ্চ মাস বা দুই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পথ্যনির্ভর রোগীদের এক মাসের বরাদ্দের বদলে মাত্র দশ দিনের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা সুবিধাবঞ্চিত রোগীদের চিকিৎসা ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের বিশেষ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে হৃদরোগ দিবস। চলতি বছরে লক্ষণ প্রকাশের আগেই রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধে সচেতনতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা মত দেন যে, উচ্চরক্তচাপের যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় সামগ্রিকভাবে হৃদরোগের ঝুঁকি উত্তরোত্তর বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতি বছর আনুমানিক ৬৫ লাখ মানুষ হৃদরোগে অকালে প্রাণ হারান। আর বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশের নেপথ্যে রয়েছে এই অসুখ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে হৃদরোগে প্রায় পৌনে তিন লাখের বেশি মানুষ মারা যান, যার অর্ধেকেরও বেশির মূল অনুঘটক ছিল অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ। ২০১৮ সালের এক জাতীয় জরিপ তুলে ধরে গবেষকরা জানান, দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় বারো শতাংশই এই সমস্যায় আক্রান্ত, যা তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি।
চিকিৎসকদের অভিমত, সাম্প্রতিক বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও সেই বর্ধিত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি উচ্চরক্তচাপের ওষুধ সংগ্রহে কাজে লাগানো যায়, তবে তৃণমূলের মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। মূলত উপজেলা পর্যায়ে ওষুধ কেনার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি তহবিল প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় এনসিডি কেন্দ্রগুলোর জন্য আলাদাভাবে পর্যাপ্ত ওষুধ কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হলে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা এখনো অতিমাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক। সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রায় তিন হাজার শয্যা থাকলেও তার সিংহভাগই রাজধানীতে সীমাবদ্ধ। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে এই আধুনিক সেবার বিস্তার না ঘটালে তৃণমূলের রোগীদের জীবন রক্ষা করা দুরূহ। রাজধানীর কেন্দ্রীয় হৃদরোগ হাসপাতালে রোগীর উপচে পড়া ভিড়ই প্রমাণ করে প্রান্তিক চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই এই প্রতিষ্ঠানে জরুরি ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ সেবা নিয়েছেন, ভর্তি হয়েছেন আশি হাজারের বেশি রোগী এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ, নিবিড় পরিচর্যা বা হাসপাতাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি রোগের মূল কারণগুলো প্রতিহত করাই সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায়। অতিরিক্ত লবণ ও স্নেহজাতীয় খাদ্য পরিহার, তামাক বর্জন, কায়িক পরিশ্রম বৃদ্ধি এবং ডায়াবেটিস, মেদ ও রক্তে চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই পারে এই অকালমৃত্যুর মিছিল রোধ করতে।