জ্বালানি উপকরণের চরম ঘাটতি, জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজ এবং বেশ কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটির যৌথ প্রভাবে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।
গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির চাহিদানুযায়ী সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যার ফলশ্রুতিতে কেন্দ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ে দেখা দিয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত লোডশেডিং। দিনভর বিদ্যুতের অনুপস্থিতিতে চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে সর্বস্তরের নাগরিক জীবনকে।
সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, দেশের চালুকৃত মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছি অর্থাৎ ৬২টি কেন্দ্রেই দৈনন্দিন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং বাকি ৪২টি কেন্দ্র সক্ষমতার তলানিতে গিয়ে সীমিত পরিসরে সচল রাখা হয়েছে। ফলস্বরূপ, দিবাকালীন সময়েই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। পূর্ববর্তী পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে এটি ছিল বিদ্যুৎ ঘাটতির অন্যতম উচ্চ মাত্রা।
দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা রয়েছে, প্রকৃত উৎপাদনের চিত্র তার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। বিগত দিনে চাহিদার পিক-আওয়ারে মোট সক্ষমতার সিংহভাগ অব্যবহৃত পড়ে থাকার একমাত্র কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক জ্বালানি ঘাটতি। বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, কারণ জাতীয় স্বার্থে এবং শিল্পখাতের চাকা সচল রাখতে বিদ্যুতের অংশ কমিয়ে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে কারখানার গ্যাস সরবরাহে।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ সংকটের যে ধারা চলে আসছে, তা মূলত ঢাকার বাইরের গ্রাহকদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরো বিস্তৃত হয়ে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনেও টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
পরিকল্পিত সাময়িক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার সূচি থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে অনিয়মিত সরবরাহের অভিযোগ নিত্যদিনের। দিনের ব্যস্ত সময় এবং রাতের বিশ্রামকাল—উভয় সময়েই ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে বহুতল ভবনে লিফট ব্যবস্থাপনা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং আবাসিক এলাকায় সুপেয় পানির পাম্প চালনায় দেখা দিচ্ছে বড় ধরনের সমস্যা।
অন্যদিকে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পারফরম্যান্সও কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে অনেক নিচে অবস্থান করছে। সক্ষমতার বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থাকার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন প্রধান কেন্দ্রের যান্ত্রিক গোলযোগ ও নিয়মিত মেরামতের প্রয়োজনীয়তা। কিছু কেন্দ্রের ইউনিটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সময়মতো না পৌঁছানোর কারণে সাময়িক কমানো হয়েছে উৎপাদন মাত্রা। পিক-আওয়ারের সীমিত চাহিদা মেটাতে এ কেন্দ্রগুলো হিমশিম খাচ্ছে।
চাপ সামাল দিতে উচ্চ খরচের তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালানোর নির্দেশনা থাকলেও ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল সংক্রান্ত কাঁচামাল সরবরাহের অচলাবস্থা সেখানে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত বেসরকারি খাত এবং পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতাগুলো মেটানো সম্ভব হলে বিকল্প তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে গ্যাস ও বিদ্যুতের যৌথ সংকট এখন শুধু আলোকসজ্জায় সীমাবদ্ধ নেই, সরাসরি আঘাত হানছে রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদনে। আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহের প্রযুক্তিগত কাঠামোতে ঘটা আকস্মিক দুর্ঘটনা এবং পরবর্তীতে নতুন সরবরাহ সময়মতো নিশ্চিত করতে না পারায় এই শূন্যতা বিস্তৃত হয়েছে। ভোক্তা অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাতের একক নির্ভরতা হ্রাস, ক্রয়প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং পুরো কাঠামোর আধুনিকায়ন ব্যতীত এ ধরনের জাতীয় সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।