জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে চলতি আগস্টে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ দৈনিক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের দেওয়া তথ্যমতে, মেরু অঞ্চল ব্যতিরেকে গত ২২ আগস্ট বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ২১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজ এই উদ্বেগের খবরটি সামনে এনেছে।
বিজ্ঞানীদের তথ্যানুযায়ী, এই মানটি ২০২৪ সালের মার্চে নিবন্ধিত ২১ দশমিক ০৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ দৈনিক উষ্ণতাকে অতিক্রম করেছে। পাশাপাশি ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে রেকর্ড হওয়া ২০ দশমিক ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ডটিও এখন হাতছাড়া হয়েছে।
সাধারণ নিয়মে দক্ষিণ গোলার্ধের আবহাওয়া সংক্রান্ত কারণে প্রতি বছর মার্চ ও এপ্রিলের দিকে বিশ্বজুড়ে মহাসাগরের উত্তাপ শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছায় এবং পরবর্তী মাসগুলোতে তা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। তবে বছরের এই সময়ে এসে ব্যতিক্রমীভাবে উষ্ণতার পারদ উঁচুতে ওঠায় পরিবেশ গবেষকরা চরম শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত তাপ সঞ্চারিত হচ্ছে। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, শুধু প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এল নিনোই এই পরিস্থিতির একক কারণ নয়। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জ্বালানি পোড়ানোর কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সমুদ্রের এই স্থায়ী উত্তাপের মূল চালিকাশক্তি।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এর সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ে রঙিন প্রবাল প্রাচীর, প্রয়োজনীয় জলজ উদ্ভিদ ও সামগ্রিক সামুদ্রিক প্রতিবেশের ওপর। উপরন্তু পানির উষ্ণতা বদলের সাথে সাথে সামুদ্রিক জীবের আবাসস্থল পরিবর্তিত হওয়ায় মৎস্য আহরণ ও কৃত্রিম জলজ চাষাবাদ বিরাট হুমকির মুখে পড়বে।
কোপার্নিকাসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত উত্তপ্ত পরিবেশের স্থায়িত্বকাল প্রায় তিন গুণের বেশি সম্প্রসারিত হয়েছে।
সমুদ্রের অস্বাভাবিক উত্তাপ বাড়ার আরও একটি ভয়াবহ দিক হলো সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া। তাপমাত্রা বাড়লে পানির আয়তন প্রসারিত হয়, যা সরাসরি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দেয়। এর বাইরে উত্তপ্ত জলরাশি থেকে বায়ুমণ্ডলে প্রভূত পরিমাণের জলীয়বাষ্প জমা হয়, যা বিভিন্ন স্থানে আকস্মিক অতিবৃষ্টি ও তীব্র সাইক্লোন সৃষ্টি করতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বাতাসের অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের বড় একটা অংশ শোষণ করে নেওয়ার যে স্বাভাবিক ক্ষমতা মহাসাগরের রয়েছে, পানির তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণক্ষমতা কমতে থাকে। ফলে বৈশ্বিক কার্বন শোষক হিসেবে অতীতে সমুদ্র যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল, ভবিষ্যতে তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।