আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির অবসরের ঘোষণায় আবেগঘন হয়ে উঠেছে দেশটির ফুটবলাঙ্গন। জাতীয় দলের হয়ে মেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্তের পর এবার তাকে বিশেষ সম্মান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)।
এএফএ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলের পুরুষ ও নারী— উভয় বিভাগের সব প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে প্রথমার্ধের ১০ মিনিট পূর্ণ হওয়ার পর এক মিনিটের জন্য খেলা বন্ধ রাখা হবে। ওই সময় মেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে চলবে করতালি।
ম্যাচের ১০ মিনিটের মাথাতেই কেন এই বিশেষ আয়োজন? এর পেছনেও রয়েছে মেসির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতীকী কারণ। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির পরিচিতি ও কিংবদন্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ১০ নম্বর জার্সি। তাই তার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ম্যাচের ১০ মিনিট শেষ হওয়ার পর খেলা থামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এএফএ।
গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। তার এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নান্দনিক ও স্মরণীয় একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচটিই জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হিসেবে থাকছে।
মেসিকে বিদায় জানাতে এএফএর পরিকল্পনা অবশ্য শুধু এক মিনিটের করতালিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে আর্জেন্টিনার নারী ও পুরুষদের সব প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে প্রথমার্ধের ১০ মিনিট পূর্ণ হলে এক মিনিটের জন্য খেলা বন্ধ থাকবে। সেই সময় স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকেরা মেসির সম্মানে করতালিতে অংশ নেবেন।
এ ছাড়া যেসব স্টেডিয়ামে বড় পর্দা বা স্ক্রিনের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেও ম্যাচ শুরুর আগে দেখানো হবে মেসিকে নিয়ে তৈরি বিশেষ একটি ভিডিও। প্রায় দুই মিনিটের ওই ভিডিওতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের নানা সময়ের ছবি ও স্মরণীয় মুহূর্ত তুলে ধরা হবে। দেশের জার্সিতে তার পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোই ফুটে উঠবে সেই ভিডিওতে।
২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল মেসির। এরপর কেটে গেছে ২১ বছর। এই দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি শুধু আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ই হননি, গড়েছেন দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ডও।
জাতীয় দলের হয়ে মেসি খেলেছেন ২০৭ ম্যাচ। এই সময়ে তিনি করেছেন ১২৫ গোল এবং তার নামের পাশে রয়েছে ১১টি হ্যাটট্রিক। আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ডও এখন তার দখলে।
বিশ্বকাপের মঞ্চেও একাধিক অনন্য কীর্তি রয়েছে মেসির। এবারের বিশ্বকাপেই তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিক করার রেকর্ড গড়েছেন। পাশাপাশি একমাত্র ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে দুটি গোল্ডেন বল জয়ের বিরল কীর্তিও রয়েছে তার।
৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান
দিয়েগো ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক শিরোপার অপেক্ষায় ছিল। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়ের পর লাতিন আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তি আর বিশ্বকাপের শিরোপা ছুঁতে পারেনি।
অবশেষে ৩৬ বছরের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে। মেসির নেতৃত্বেই আবারও বিশ্বকাপের ট্রফি ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা। সেই টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও পূরণ করেন তিনি।
তবে বিশ্বকাপ জয়ের পথটি মেসির জন্য সবসময় এতটা সহজ ছিল না। এর আগে ২০১৪ সালেও তার নেতৃত্বে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে শিরোপা থেকে বঞ্চিত হয় মেসির দল।
এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসির নেতৃত্বে ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। তবে সেখানেও শিরোপা ছোঁয়া হয়নি। তবু দলকে চারটি বিশ্বকাপের তিনটিতে ফাইনালে তোলার কৃতিত্ব রয়েছে মেসির।
কোপা আমেরিকার খরাও কাটিয়েছেন
মেসির নেতৃত্বে শুধু বিশ্বকাপের আক্ষেপই ঘোচেনি, শেষ হয়েছে কোপা আমেরিকার দীর্ঘ শিরোপা-খরাও। ২৮ বছর কোনো বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা না পাওয়ার পর ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার ট্রফি জেতে আর্জেন্টিনা। এরপর ২০২৪ সালেও মেসির নেতৃত্বে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা ধরে রাখে দলটি।
এর মাঝেই লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের দুই মহাদেশসেরা দলের লড়াই ফিনালিসিমাতেও সাফল্য পেয়েছে মেসির আর্জেন্টিনা। ফলে জাতীয় দলের হয়ে মেসির ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি পূর্ণ হয়েছে একের পর এক আন্তর্জাতিক সাফল্যে।
একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার কারণে যে মেসিকে নিয়ে ছিল নানা সমালোচনা, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক শিরোপা-খরা কাটিয়ে দেশের ফুটবলের ইতিহাসে নিজেকে স্থায়ীভাবে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছেন। তার বিদায়কে তাই শুধু একজন ফুটবলারের অবসর হিসেবে দেখছে না আর্জেন্টিনা; বরং একটি দীর্ঘ ও গৌরবময় ফুটবল যুগের সমাপ্তি হিসেবেই দেখছে দেশটির ফুটবলমহল।