যুক্তরাজ্যের কেন্টে ডোভার বন্দরের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন মুখোশধারী একদল অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারী। শনিবার সকালে কালো পোশাক ও বালাক্লাভা পরে কয়েক ডজন মানুষ বন্দরমুখী সড়কে অবস্থান নিলে দুই দিকের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে বন্দর এলাকায় কয়েক মাইলজুড়ে যানজট তৈরি হয় এবং ফেরির যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ডোভার বন্দর কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ডানপন্থি ও অভিবাসনবিরোধী সংগঠন প্যাট্রিয়ট প্ল্যাটফর্ম এই বিক্ষোভের নেপথ্যে ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডানপন্থি কর্মী টমি রবিনসনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভের ভিডিও প্রকাশ করে অন্যদের সেখানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, কালো পোশাক ও মুখোশ পরা বিপুলসংখ্যক মানুষ দলবদ্ধ হয়ে ডোভার বন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। পরে তারা এ২০ সড়কে হাত ধরে মানবপ্রাচীর তৈরি করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।
বিক্ষোভকারীদের ‘স্টপ দ্য বোটস’ এবং ‘ইংল্যান্ড টিল আই ডাই’ স্লোগান দিতে শোনা যায়। ছবিতে দেখা গেছে, অবরোধের কারণে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো সড়কে আটকা পড়ে আছে। আশপাশে পুলিশের গাড়িও অবস্থান করছিল।
বিক্ষোভে ঠিক কতজন অংশ নিয়েছেন, তা পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তবে একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, তিনি সেখানে ৩০০ বা তার বেশি মানুষ দেখেছেন। অন্যদিকে প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, বিক্ষোভস্থলে কয়েক ডজন মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
বিক্ষোভের কারণে ডোভার বন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়ার প্রধান সড়ক এ২০-তে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ন্যাশনাল হাইওয়েজ জানিয়েছে, এর ফলে যানজট প্রায় চার মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রীদের সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিলম্বের মুখে পড়তে হয়।
এর প্রভাব শুধু বন্দর এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ডোভার ওয়াটারফ্রন্ট পার্করানও বাতিল করা হয়। আয়োজকেরা জানান, বিক্ষোভের কারণে নির্ধারিত পথটি নিরাপদ ছিল না অথবা অবরোধের কারণে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছিল না।
স্থানীয় কাউন্সিলররা জানিয়েছেন, বন্দরে রাতের শিফটে কাজ করা কর্মীদের কেউ কেউ অবরোধের কারণে বের হতে পারছিলেন না। তবে দুপুরের দিকে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। ডোভার বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বিক্ষোভকারীরা সরে গেছেন এবং বন্দরে ঢোকা ও বের হওয়ার সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্টে বিক্ষোভের সঙ্গে প্যাট্রিয়ট প্ল্যাটফর্মের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সংগঠনটি নিজেদের ‘নিজেদের মাতৃভূমির প্রতি প্রবল ভালোবাসা’সম্পন্ন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচয় দেয়।
ড্যানি টমো নামে পরিচিত সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ড্যানি থমাস শনিবার সকালে ডোভার থেকে লাইভ ভিডিও প্রকাশ করেন। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি অনুসারীদের জানিয়েছিলেন, সরকারের কাছে একটি বার্তা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, খুব শিগগিরই এমন একটি বার্তা দেওয়া হবে, যাতে সরকার বুঝতে পারে তারা ‘লড়াই ছাড়া পিছিয়ে যাবে না।’
তার বক্তব্যে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বানও ছিল।
এদিকে ব্রিটিশ ডানপন্থি কর্মী টমি রবিনসন নামে পরিচিত স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন বিক্ষোভের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুনরায় পোস্ট করেন। তিনি একটি লাইভস্ট্রিমের দিকেও অনুসারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যেখানে দর্শকদের প্যাট্রিয়ট প্ল্যাটফর্মের দিকে নির্দেশ করা হচ্ছিল।
অন্য একটি পোস্টে রবিনসন বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে আরও মানুষকে ডোভারে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, ডোভারের বিভিন্ন স্থানে একই সময়ে বন্দর বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও জায়গায় এমন কর্মসূচি হতে পারে।
স্থানীয় রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া
ডোভার অ্যান্ড ডিলের লেবার এমপি মাইক ট্যাপ বিক্ষোভকারীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। বন্দর এলাকায় বিশৃঙ্খলা এবং স্থানীয় পার্করান বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডোভারকে অচল করতে আসা লোকজনের কারণে তিনি বিরক্ত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে আসার ঘটনা ৪০ শতাংশ কমেছে এবং সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে।
ডোভার জেলা পরিষদের কনজারভেটিভ গ্রুপের নেতা ক্রিস ভিনসনও ঘটনাটিকে ‘অবৈধ অভিবাসনবিরোধী’ বিক্ষোভ হিসেবে দেখছেন। তবে তার প্রধান উদ্বেগ ছিল বিক্ষোভকারীদের পোশাক ও আচরণ নিয়ে।
ভিনসনের ভাষ্য, কালো সামরিক ধাঁচের পোশাক ও বালাক্লাভা পরা লোকজন গাড়ির চলাচলের পথ আটকে দিলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পুলিশ আগে থেকে ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত না থাকায় স্থানীয় মানুষকে সতর্ক করার সুযোগও ছিল না।
স্থানীয় রিফর্ম ইউকে কাউন্সিলর পল কিংও বাসিন্দাদের বন্দর এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, তাকে বলা হয়েছে এটি ‘স্টপ দ্য বোটস’ বিক্ষোভ।
সরকারের কড়া প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার গণতন্ত্রের মৌলিক অংশ। তবে ডোভারে যে ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে এবং এর কারণে যাত্রীদের চলাচলে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, সরকার তার নিন্দা করেছে।
হোম অফিসের এক মুখপাত্র বলেন, বিক্ষোভের কারণে যারা ভোগান্তিতে পড়েছেন, তাদের হতাশা সরকার বুঝতে পারছে। একই সঙ্গে পুলিশ ও পরিবহন সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে যাত্রী ও স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
বিকেলের দিকে ডোভার বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্দরটির প্রবেশপথ আবার স্বাভাবিক হয়েছে এবং যান চলাচল অবাধে চলছে।
ফেরি যাত্রীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা
বিক্ষোভের কারণে নির্ধারিত সময়ে বন্দরে পৌঁছাতে না পারা যাত্রীদের পরবর্তী ফেরিতে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফেরি অপারেটররা। ডিএফডিএস জানিয়েছে, বন্দরে প্রবেশের পথে যানজটের বিষয়টি তারা জানে। যাত্রীরা বন্দরে পৌঁছানোর পর পরবর্তী যাত্রায় তাদের স্থান দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
পিঅ্যান্ডও ফেরিও জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত ফেরিগুলো চলাচল অব্যাহত ছিল। তবে যানজটের কারণে কেউ নির্ধারিত ফেরি মিস করলে তাকে পরবর্তী ফেরিতে নেওয়া হবে।
অভিবাসন ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা
ডোভার যুক্তরাজ্যে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় প্রবেশকারী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ। ফলে দেশটির অভিবাসননীতি এবং ‘ছোট নৌকা’ সংকট নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। এবারের বিক্ষোভ সেই বিতর্ককে আবারও রাস্তায় নিয়ে এসেছে।
তবে এবারের ঘটনায় রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরমুখী সড়ক অবরোধ এবং কয়েক ঘণ্টা যাতায়াত ব্যাহত করার ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দিনের শেষ দিকে বন্দর এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ঘটনাটি যুক্তরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান সংগঠিত রূপ এবং ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।