সোমবার, 21 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

লংমার্চ থেকে ‘বৃহত্তর আন্দোলনে’র হুঁশিয়ারি, যে বার্তা দিলো বিরোধী জোট

নেতাদের বক্তব্যে একদিকে সরকারের প্রতি এসব দাবি পূরণের আহ্বান এসেছে, অন্যদিকে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও কঠোর করার বার্তাও দিয়েছেন তারা। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচিকে আরও বড় আন্দোলনের দিকে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

লংমার্চ থেকে ‘বৃহত্তর আন্দোলনে’র হুঁশিয়ারি, যে বার্তা দিলো বিরোধী জোট
ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

জনগণের দুর্ভোগ নিরসন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। শনিবার দিনভর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পথসভা ও সমাবেশে এসব দাবি তুলে ধরার পাশাপাশি দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাপনী সমাবেশে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান নেতাকর্মীদের ‘বৃহত্তর আন্দোলনে’র জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চ শুরু হয়। পথে নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল, কুমিল্লার পদুয়া বাজার ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পথসভা হয়। রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।

লংমার্চে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ জোটের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।

১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ দমন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।

শাপলা চত্বর: অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন

সকাল ৭টার দিকে শাপলা চত্বরে সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া সমাবেশে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।

সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের লংমার্চ ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে।’ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংকটে ভুগছে, অথচ তাদের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবিও তুলে ধরেন তিনি।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এ লংমার্চ আপামর জনতার।’ সরকার লংমার্চে বাধা দিলে সব বাধা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ১১ দলের ছয় দফা দাবি একসময় এক দফায় রূপ নেবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, সরকার জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ক্ষমতায় বসে জাতিকে ভুল পথে পরিচালনার চেষ্টা করা হলে তাদের টেনে নামাতে হাত কাঁপবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে ব্যর্থ হয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সরকারকে সংসদে ভুল স্বীকার করে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নারায়ণগঞ্জ: সরকারকে প্রতারণার অভিযোগ

শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চ শুরু হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় প্রথম পথসভা হয়। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি ও প্রতারণা করছে। ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা লঙ্ঘন করছে। জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এই রাস্তায় মানুষের সঙ্গীরা রক্ত দিয়েছেন। তাদের দাবি পূরণ হয়নি। সেই দাবি পূরণ করতেই তারা রাস্তায় নেমেছেন।

গণভোটের গণরায় ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনগণের ঘরে গ্যাস ফিরিয়ে দেওয়া এবং বিদ্যুৎ ও বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করার দাবিও জানান তিনি। ১১ দলীয় জোটের ঐক্যের কথা তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, ১১ দল জনগণের পাশে আছে এবং জনগণও ১১ দলের সঙ্গে আছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরকারকে সরবরাহ করতে হবে। তা না হলে সরকার গদিতে থাকতে পারবে না। এ সময় তিনি গ্যাস, বিদ্যুৎ, তেল ও পানির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং গণভোটের গণরায় মানার দাবি জানান।

অলি আহমদ বলেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ যে রায় দিয়েছে, সেটি কার্যকর করতে হবে। রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত না হলে সরকারকে ব্যর্থ করা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন এবং দেশকে সঠিক গন্তব্যে এগিয়ে নিতে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। লংমার্চের মধ্য দিয়ে চলমান আন্দোলনের ‘দ্বিতীয় পর্ব’ শুরু হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কুমিল্লা: সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে অভিযোগ

দুপুরে কুমিল্লার পদুয়া বাজার এলাকায় পথসভা হয়। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ বর্তমান সরকারের কাছ থেকে মুক্তি চায়। নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া কথা সরকার রক্ষা করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বক্তব্যের শুরুতেই কুমিল্লা বিভাগ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান জামায়াত আমির। একই সঙ্গে কুমিল্লা বিমানবন্দর চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আহ্বান জানান তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৯৪ সালে সিলেট বিভাগ হওয়ার সময় একই সঙ্গে কুমিল্লা বিভাগ করার দাবি উঠেছিল। কিন্তু কুমিল্লা বিভাগ হয়নি। কুমিল্লাবাসীর অপরাধ কী—প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে আর ‘ধানাই-পানাই’ না করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি বৃহত্তর নোয়াখালীও বিভাগ দাবি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারাও দাবিদার; তবে আগে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে।

কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির।

এনসিপির নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকারের মন্ত্রীদের সন্তান, পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের অনেকে দুর্নীতি ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। গত ছয় মাসে সরকার দেশ পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অলি আহমদ বলেন, জনগণের বক্তব্য শুনতে হবে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ বর্তমান সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, জায়গা দখল, নেতাকর্মীদের হয়রানি ও মাদকের অভিযোগ তুলে তিনি সরকারের সমালোচনা করেন।

সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও মন্তব্য করেন অলি। তিনি বলেন, মানুষের মুখে মুখে আছে যে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের পতন হবে। সরকার কিছু করুক বা না করুক, ‘নিজের ভারে নিজেই পড়ে যাবে।’

মামুনুল হক বলেন, জনগণের রায় কার্যকর করে জনদুর্ভোগ কমাতে সরকার ব্যর্থ হলে জনতার মিছিল আরও দীর্ঘ হবে। সেই মিছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গণজোয়ারে পরিণত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভোট ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে সরকার ক্ষমতায় এসেছে অভিযোগ করে মামুনুল হক বলেন, দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে তারা তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ৭০ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা চলতে থাকলে সরকারের পরিণতি অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের মতো হবে।

চৌদ্দগ্রাম: বিদ্যুৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের পথসভায় বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী একসময় তাদের কাছে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে একটি পরিকল্পনা চেয়েছিলেন। তারা পরিকল্পনা দিলেও এরপর আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধীদের কাছে পরিকল্পনা চাওয়ার অর্থ হলো সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে কি না, সেটি স্বীকার করা। তাদের দেওয়া পরিকল্পনার পর বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করেছিলেন তারা, কিন্তু তা হয়নি।

এই পথসভায় গাজীপুরের তরুণ সিফাত আবদুল্লাহর প্রসঙ্গও তোলেন জামায়াত আমির। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষুব্ধ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। অবিলম্বে সিফাতকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান শফিকুর রহমান।

মহিপাল: বিদ্যুৎ ও বিচার নিয়ে ক্ষোভ

বিকেল ৪টার দিকে ফেনীর মহিপালে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে। সংসদে বিদ্যুৎ থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে না।’

গণহত্যার বিচার শুরু না হওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, গত ছয় মাসে শাপলা চত্বর ও পিলখানার হত্যাকাণ্ডের মতো বড় বড় ঘটনার বিচার শুরু হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যেসব বিচার শুরু হয়েছিল, তার অনেকগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কারও মামার বাড়ি বা পিসির বাড়ি নেই। আমরা এ দেশেই জন্ম নিয়েছি। এ দেশ আমাদের ঠিকানা।’ তরুণদের হাতে দেশ তুলে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর বর্তমান সরকার তার কোনো আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। র‍্যাব বিলুপ্ত না করে নতুন নামে আনার উদ্যোগ এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন হলে বিএনপিকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। লংমার্চের পর ঢাকায় জনসভা করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণার কথাও জানান নাহিদ।

অলি আহমদ বলেন, বর্তমান সরকারের আত্মবিশ্বাস নেই। তারা গণভোটের রায় মানছে না। জোর করে হলেও সরকারকে গণভোটের রায় মানতে বাধ্য করা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ভালো নেই। দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ নেই। বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং সরকারে অদক্ষ ব্যক্তিদের মন্ত্রী করার সমালোচনা করেন তিনি। দাবি না মানলে লংমার্চের ছয় দফা ভবিষ্যতে এক দফায় রূপ নেবে বলে জানান তিনি।

মামুনুল হক বলেন, তারা সংস্কার ও জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তি। ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে পক্ষে রায় দিলেও তা বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ তুলে বিএনপির বিরুদ্ধে আরও কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেন তিনি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি বিএনপির মহাসচিব থাকাকালে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। তারাও এখন একই দাবিতে আন্দোলন করছেন।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, লংমার্চের মাধ্যমে ১১ দলীয় ঐক্যের আন্দোলন শুরু হলো। পরে তা ঢাকা ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে। তবে এখনই ঢাকা ঘেরাওয়ের পরিকল্পনা নেই বলেও জানান তিনি।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জনগণের জন্য তেলের ব্যবস্থা করার দাবি জানান। সরকার তা না পারলে ১১ দলীয় জোটের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান তিনি।

এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, সরকার জনগণের পকেট কাটা শুরু করেছে এবং গণভোটের রায় নিয়ে ‘নয়-ছয়’ করছে।

মহিপালের পথসভা ও লংমার্চের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী যানবাহনকে একপর্যায়ে ঢাকা অভিমুখী লেন দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে দীর্ঘ গাড়ির জট তৈরি হয়।

লালদীঘি: বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

দিনভর পথসভা শেষে রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ৭০ শতাংশের রায়কে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। জনগণ তাদের যে দায়িত্ব দিয়েছে, তারা তা পালন করবেন। কোনো প্রলোভন দেখিয়ে বিরোধী শক্তিকে কেনা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ছয় দফা ১১ দলের কোনো ব্যক্তিগত দাবি নয়, এগুলো দেশের জনগণের দাবি উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রের সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ছিল মানুষের। সরকার গণভোটের রায় উপেক্ষা করেছে অভিযোগ করে জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সম্মান দেখিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সমাপনী সমাবেশে শাপলা চত্বর, পিলখানা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার দাবি করেন শফিকুর রহমান। পিলখানায় নিহত সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড এবং আয়নাঘর ও জল্লাদখানার সঙ্গে জড়িতদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

হত্যা, গুম, নির্যাতন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি শিগগিরই আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা প্রস্তুত থাকুন, বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে। আমরা আসছি, এই লড়াইয়ে জনগণের বিজয় হবে।’

বিএনপির উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, আগের সরকার যে রাস্তা দিয়ে বিদায় নিয়েছে, বিএনপিও সেই রাস্তায় হাঁটতে চায় কি না, তা দেখতে হবে। বিরোধী দল নীরব রয়েছে বলে সরকার যা খুশি করতে পারবে—এমনটি ভাবার কারণ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়রের প্রসঙ্গ তুলে তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, বিএনপি ওয়াদা করেছিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দেশ চালাবেন। এখন যাদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়েছে, তারা নির্বাচিত কি না—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, তারা রাজপথে আসতে চাননি; সংসদের ভেতরেই বিষয়গুলোর সমাধান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাদের রাজপথে আসতে বাধ্য করেছে। গণভোটের রায় তারা আদায় করে ছাড়বেন বলেও ঘোষণা দেন তিনি।

লংমার্চে কত গাড়ি

লংমার্চে গাড়ির সংখ্যা নিয়েও দিনভর আলোচনা ছিল। কর্মসূচির আগে ৫ থেকে ৬ হাজার গাড়ি রাখার কথা বলা হলেও জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে তা কমিয়ে প্রায় এক হাজারে নামানোর কথা জানানো হয়। পরে জোটের পক্ষ থেকে বহরে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।

তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ের তথ্য বলছে, লংমার্চে ৬০০-এর কিছু বেশি গাড়ি টোল দিয়ে সেতু দুটি পার হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ শতাধিক ছিল বড় মাইক্রোবাস। এ ছাড়া জিপ, কার ও কয়েকটি বাসও ছিল।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, মাইক্রো ও কারের টোল ৭০ টাকা করে। বাসের টোল কিছুটা বেশি। সব মিলিয়ে সেতু দুটির টোল বাবদ ৪০ হাজার টাকার বেশি আয় হয়েছে।

মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতু দিয়ে লংমার্চের কত গাড়ি পার হয়েছে বা কত টাকা টোল আদায় হয়েছে—এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে সওজের কেউ বক্তব্য দিতে চাননি। তবে একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, লংমার্চ নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং টোল দিয়ে সেতু পার হয়েছে।

জোটের সূত্র বলছে, মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতু পার হওয়ার পর পথে কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকার আরও গাড়ি বহরে যুক্ত হয়। ফলে চট্টগ্রামের দিকে যাওয়ার সময় বহরের গাড়ির সংখ্যা বাড়ে।

মহাসড়কে যানজট

লংমার্চের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচলেও ধীরগতি দেখা দেয়। কুমিল্লার পদুয়া বাজারে পথসভায় নেতাকর্মীদের একটি অংশ মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে অবস্থান করায় সেখানে যান চলাচল ধীর হয়ে যায়। একই সময়ে চট্টগ্রামমুখী লেনে লংমার্চের গাড়িবহর চলায় থেমে থেমে যানজট তৈরি হয়।

ফেনীর মহিপালেও লংমার্চ ও পথসভার কারণে চট্টগ্রামমুখী যানবাহনকে ঢাকা অভিমুখী লেন দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে মহাসড়কে দীর্ঘ গাড়ির জট তৈরি হয়।

সামনে আরও কর্মসূচি

লংমার্চকে এক দিনের কর্মসূচি হিসেবে দেখছে না ১১ দলীয় ঐক্য। জোটের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ধারাবাহিক এসব কর্মসূচির পর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ করার কথা রয়েছে।

দিনভর পথসভা ও সমাপনী সমাবেশে জোটের নেতারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের সমাধান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। এসব দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

নেতাদের বক্তব্যে একদিকে সরকারের প্রতি এসব দাবি পূরণের আহ্বান এসেছে, অন্যদিকে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও কঠোর করার বার্তাও দিয়েছেন তারা। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচিকে আরও বড় আন্দোলনের দিকে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।