আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশকে কেবল প্রযুক্তির সাধারণ ভোক্তা না রেখে উদ্ভাবন ও রপ্তানিমুখী শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ও গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির এই শীর্ষ নেতা রফতানি বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ, আইসিটি খাতের প্রসার, বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর জোরালো তাগিদ দিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রচলিত তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের বাইরে গিয়ে উচ্চমূল্যের ডিজিটাল সেবা ও প্রযুক্তি খাতকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাম্বাসেডর ফেরদৌস শাহরিয়ার মিলনায়তনে যৌথভাবে আয়োজিত এআই ও উদ্ভাবন বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে তিনি এসব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
বক্তব্যে তিনি তুলে ধরেন, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশ প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয় করলেও তার সিংহভাগই এসেছে পোশাক খাত থেকে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় এসেছে ৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের মতো। তবে অর্থনীতির এই দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কিংবা ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে অবিলম্বে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের ক্ষেত্রগুলো বহুমুখী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই প্রযুক্তিকে কেবল দাপ্তরিক গতিশীলতার হাতিয়ার হিসেবে না দেখে বিলিয়ন ডলার আয়ের সফটওয়্যার ও সেবা খাতের মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তুলনামূলক ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলের শক্তিশালী প্রযুক্তি খাতের দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, আমাদের বিপুল তরুণ মেধার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একই ধরনের বৈপ্লবিক অগ্রগতি অর্জন করা অসম্ভব নয়।
সিলিকন ভ্যালিতে সরকারি প্রতিনিধিদের সাম্প্রতিক সফরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, অ্যাপল, মেটা কিংবা এনভিডিয়ার মতো প্রথম সারির বহুজাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ব্যাপারে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে এবং অ্যানথ্রপিকও এখানে কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে।
বিদেশে অবস্থানরত দূতাবাসগুলোর বাণিজ্যিক শাখাকে গতানুগতিক কাজের বাইরে এসে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশনা দেন তিনি।
তিনি স্পষ্টভাবে জোর দিয়ে বলেন, আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য প্রযুক্তির ভোক্তা পর্যায়ে আটকে থাকা নয়, বরং এর আবিষ্কারক ও আন্তর্জাতিক বিক্রেতা হওয়া।
ডিজিটাল পরিচয়পত্র, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো অভ্যন্তরীণ খাতে দেশীয় এআই সমাধান তৈরির মাধ্যমে সেগুলোর বৈশ্বিক বাজার ধরার পাশাপাশি কম্পিউটার ও ল্যাপটপসহ প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার সামগ্রীর আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে স্থানীয় উৎপাদনের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
এ সংক্রান্ত চিন্তাভাবনাকে নিছক সভা-সেমিনারে আটকে না রেখে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সমন্বয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় রূপরেখা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ বিদেশি কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, আইসিটি বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ী সমাজের শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।