রবিবার, 20 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনে সংসদে বিল, ৮ আপত্তি বিরোধী দলের

বিরোধী দলের সদস্যরা বিলের অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি ও সদস্যসচিব এসআরবির কর্মকর্তা হওয়ায় অভিযোগের তদন্তে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। এ কারণে অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে সভাপতি করে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।

র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনে সংসদে বিল, ৮ আপত্তি বিরোধী দলের

র‍্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের জন্য আনা বিল নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আটটি বিষয়ে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) দিয়েছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তাদের আপত্তির মধ্যে রয়েছে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা, আটক ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণ এবং এসআরবির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬ পরীক্ষা করে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়। কমিটির বিরোধী দলের দুজন সদস্য লিখিতভাবে তাদের ভিন্নমত তুলে ধরেন। বুধবার বিলটির ওপর সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর বৃহস্পতিবার বিলটি পাস হতে পারে।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেন বলেন, র‍্যাব বিলুপ্ত করার অঙ্গীকার থাকলেও নতুন বিলে নাম পরিবর্তন ছাড়া কার্যত বাহিনীটির কাঠামো একই রাখা হচ্ছে। এ কারণে তারা বিলের সাত থেকে আটটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। তবে কোন কোন বিষয়ে ভিন্নমত দেওয়া হয়েছে, তা তিনি বিস্তারিত জানাননি।

কমিটির একাধিক সূত্র জানায়, বিরোধী দলের সদস্যরা বিলটি দ্রুত পাস না করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু নাম পরিবর্তন করলেই র‍্যাব ও এসআরবির মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য তৈরি হবে না। র‍্যাবের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে এবং এসব অভিযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। ফলে নতুন বাহিনীর আইন, তদারকি ও কার্যক্রম বাস্তবে কতটা আলাদা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা নিয়ে আপত্তি

বিরোধী দলের সদস্যরা বিলের অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি ও সদস্যসচিব এসআরবির কর্মকর্তা হওয়ায় অভিযোগের তদন্তে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে।

এ কারণে অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে সভাপতি করে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।

এ ছাড়া এসআরবি কোনো বেসামরিক ব্যক্তিকে কোথায় ও কতক্ষণ আটক রাখতে পারবে, বিলটিতে তা স্পষ্ট করা হয়নি বলেও আপত্তি জানানো হয়েছে। এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার সুযোগ থাকলেও সেগুলোর অবস্থান প্রকাশ এবং আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।

বিরোধী দলের প্রস্তাব অনুযায়ী, এসআরবির প্রতিটি দপ্তর, ক্যাম্প, হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ সরকারি গেজেটে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক আটক ব্যক্তির নাম, আটকের সময় ও স্থান, আইনি কারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসা এবং থানায় হস্তান্তরের তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করতে হবে।

আরেকটি ধারার বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়ে তারা প্রস্তাব করেছেন, এসআরবি যে জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সেখানে মাসিক কার্যবিবরণী দিতে হবে।

‘র‍্যাবের কাঠামোর বড় অংশই থাকছে’

সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে বিলটি সংশোধিত আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

বৈঠকে বলা হয়, অতীতে র‍্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নানা ক্ষেত্রে অপব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোনো বাহিনীর অপব্যবহারের কারণে পুরো বাহিনী বিলুপ্ত না করে দক্ষ জনবল ও বিদ্যমান সরঞ্জাম যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি সদস্যদের প্রশিক্ষণ, পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আইনগতভাবে র‍্যাব বিলুপ্ত হলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার বড় অংশই এসআরবিতে থাকছে। র‍্যাবের বর্তমান জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, নথি ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবির কাছে হস্তান্তর করা হবে। র‍্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসআরবির সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন।

এ ছাড়া র‍্যাবের দায়দায়িত্ব, চুক্তি এবং পক্ষে বা বিপক্ষে চলমান মামলাগুলোও এসআরবির নামে চলবে।

২০০৩ সালে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ সংশোধনের মাধ্যমে র‍্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাহিনীটি সমালোচিত হয়ে আসছে। এখন ওই অধ্যাদেশ থেকে র‍্যাব-সংক্রান্ত বিধান বাদ দিয়ে বাহিনীটি বিলুপ্ত এবং পৃথক আইনের মাধ্যমে এসআরবি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

র‍্যাবের অতীত কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অতীতে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র‍্যাব এবং বাহিনীটির সাবেক ও তৎকালীন সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

বিএমইউর আট অডিট আপত্তি নিয়ে আলোচনা

এদিকে মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটির প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক পিজি হাসপাতাল) আটটি অডিট আপত্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, কিছু আপত্তি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাকি আপত্তিগুলো খতিয়ে দেখতে কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি উপকমিটি করা হয়েছে। তারা সরেজমিন তদন্ত করে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। এরপর সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, একটি অডিট আপত্তিতে দেখা গেছে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী লাভের ওপর বিশেষজ্ঞদের ৩০ শতাংশ কমিশন পাওয়ার কথা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা লাভের পরিবর্তে মোট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ কমিশন নিচ্ছেন।

সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করে তালিকা দিতে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককে (সিএজি) নির্দেশনা দিয়েছে কমিটি।

বৈঠকে কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমান, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, এ কে এম ফজলুল হক মিলন, মাহবুবুর রহমান, হাফিজ ইব্রাহীম, এস কে আজিজুল বারী, মনজুরুল ইসলাম, ফজলে হুদা, মোহাম্মদ জাকির হোসেন, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ও রুহুল আমিন উপস্থিত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ রকিবুল ইসলামসহ কমিটির সদস্যরা অংশ নেন।