ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম ও তার সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশে টানা কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণের ফলে সেখানে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মৌসুমের প্রথম দফার এই পাহাড়ি ঢল ও প্লাবনে রাজ্যের অন্তত ছয়টি জেলার ২২ হাজারেরও বেশি বাসিন্দা চরম ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন। রোববার সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
আসামের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, অবিরাম বৃষ্টির কারণে ঐতিহ্যবাহী ব্রহ্মপুত্র নদসহ ওই অঞ্চলের ছোট-বড় সবকটি উপনদীর পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে ক্রমেই আরও জটিল করে তুলছে। এখন পর্যন্ত লখিমপুর, ধেমাজি, ডিব্রুগড়, নলবাড়ি, চিরাং ও কোকড়াঝাড় জেলা বন্যা কবলিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা তৈরি হয়েছে ধেমাজি জেলায়, যেখানে পনের হাজার চারশত তেষট্টি জন মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বন্যার তীব্র স্রোতে ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলের ৯৬টি গ্রাম সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে এবং প্রায় ১,৬৯০ হেক্টর জমির দাঁড়িয়ে থাকা ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ফসলের পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদের প্রায় আটচল্লিশ হাজারেরও বেশি গবাদি পশু এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়েছে। এছাড়া শিবসাগর জেলার নাঙ্গলামুরাঘাট পয়েন্টে দিসাং নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার বেশ ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ধেমাজি জেলায় শিমেন নদীর ওপর স্থাপিত একটি রেলসেতুর অংশবিশেষ ধসে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট রেল বিভাগের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, ধেমাজি ও তার আশপাশের অববাহিকায় ১১০ মিলিমিটারের বেশি রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট তীব্র নদী ভাঙন ও রেললাইনের ক্ষতি হওয়ায় আর্চিপাথার এবং সিমন চাপারি স্টেশনের মধ্যবর্তী লাইনে আপতত ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।
রেলওয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ১৯৬৫ সালে নির্মিত এই পুরনো সেতুটির সার্বিক কাঠামো বেশ মজবুত ও নিরাপদ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অতিবর্ষণে নদীর তীরের বিশাল অংশ ধসে যাওয়ায় সেতুর একটি পিলারের নিচের মাটি সরে যায় এবং স্তম্ভটি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। তবে লাইনটি কম ব্যস্ত থাকায় এবং বন্যার পূর্বাভাসের কারণে আগেই ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখায় বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তিনসুকিয়া বিভাগের আওতাধীন মুরকংসেলেক ও সিলাপাধারের মধ্যকার যোগাযোগ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে এবং এই রুটের ট্রেনগুলো সিলাপাথার স্টেশন পর্যন্ত যাতায়াত করবে।
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অঞ্চলের রেলযাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিকল্প হিসেবে বিশেষ বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের সার্বিক তথ্য ও জরুরি সহায়তা দিতে ধেমাজি, সিলাপাথার ও মুরকংসেলেক রেল স্টেশনে সার্বক্ষণিক হেল্প ডেস্ক চালু করা হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও রাজ্য সরকারের সাথে যৌথভাবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।